Read Love by Sohagi Baski in Bengali Short Stories | মাতরুবার্তি

Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

ভালোবাসা





তোমার আমার এক রাস্তায় প্রথম দেখা হয়েছিল। সেদিনের সেই পথটা হয়তো অন্য সবার কাছে আর পাঁচটা সাধারণ রাস্তার মতোই ছিল, কিন্তু রাবিয়া নূরের কাছে সেই পথটা হয়ে গিয়েছিল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা। কারণ সে জানত না, সেই রাস্তায় দেখা হওয়া মানুষটাই একদিন তার সবচেয়ে আপন হয়ে উঠবে, আবার একদিন সেই মানুষটার বদলে যাওয়া আচরণই তাকে ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন সত্যিটা শিখিয়ে দেবে। প্রথম দেখায় তোমার মধ্যে এমন কিছু ছিল না, যেটাকে রাবিয়া আলাদা করে মনে রাখবে। অথচ অদ্ভুতভাবে সেই সামান্য দেখাটাই ধীরে ধীরে পরিচয়ে বদলে গেল, পরিচয় থেকে কথা, আর কথাগুলো কখন যে রাবিয়ার প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে উঠল, সে নিজেই বুঝতে পারেনি। প্রথম দিকে তুমিই তাকে এই সম্পর্কে আসার জন্য বারবার বুঝিয়েছিলে। তোমার কথায় ছিল যত্ন, ব্যবহারে ছিল আন্তরিকতা, আর চোখে ছিল এমন এক বিশ্বাস, যেটা দেখে রাবিয়ার মনে হয়েছিল—হয়তো সত্যিই মানুষকে বিশ্বাস করা যায়। রাবিয়া আগে কখনও এসব কথায় খুব একটা বিশ্বাস করত না। মানুষ সম্পর্কে সে শুনেছিল, “কিছুদিন সময় দাও, তাহলেই মানুষের আসল রূপ বুঝতে পারবে।” কিন্তু সে কথাগুলোকে কখনও গুরুত্ব দেয়নি। তার মনে হতো, মানুষ যদি সত্যি ভালোবাসে, তাহলে সময়ের সঙ্গে সেই ভালোবাসা আরও গভীর হবে, কমবে না। কিন্তু তুমি এসে তার সেই ধারণাটাই বদলে দিলে। প্রথম দিনের তুমি আর আজকের তুমি যেন দুজন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। সেই প্রথম দিনের ভালো মানুষটা কোথায় হারিয়ে গেল, রাবিয়া আজও জানে না। একসময় যে মানুষটা নিজে থেকে তার খোঁজ নিত, সে খেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করত, ঠিকমতো ঘুমিয়েছে কিনা জানতে চাইত, মন খারাপ হলে কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করত—আজ সেই মানুষটার কাছেই রাবিয়ার জন্য যেন কয়েকটা মুহূর্ত সময় বের করার সুযোগ নেই। অথচ সেই দিনগুলো কত সুন্দর ছিল! কত রাত হাসি-খুশিতে কেটে গেছে, কত অকারণ কথায় দুজন হেসেছে, কত ছোট ছোট বিষয় নিয়ে অভিমান হয়েছে, আবার সেই অভিমানও মিটে গেছে। রাবিয়া তখন ভাবত, এই মানুষটা হয়তো সত্যিই তার জীবনে থেকে যাবে। সে ভাবেনি, একদিন সেই একই মানুষটার একটা ছোট্ট মেসেজের জন্য তাকে এতটা অপেক্ষা করতে হবে। এখন তো কথা বলা দূরের বিষয়, ফোনের স্ক্রিনে তোমার একটা মেসেজও আসে না। তবুও রাবিয়ার অভ্যাসটা বদলায়নি। ফোনে মেসেজ আসার শব্দ হলেই তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। সে তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে নেয়, মনে হয়—হয়তো তুমি মেসেজ দিয়েছ। হয়তো এতদিন পর লিখেছ, “কেমন আছো?” হয়তো আবার আগের মতো কথা বলতে চেয়েছ। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই আশাটা ভেঙে যায়। স্ক্রিনে অন্য কারও নাম দেখতে পেয়ে রাবিয়া চুপচাপ ফোনটা নামিয়ে রাখে। তারপর নিজেকেই বোঝায়, “হয়তো ব্যস্ত।” কিছুক্ষণ পর আবার মনে হয়, “হয়তো কোনো সমস্যা হয়েছে।” আরেকটু পরে নিজেকেই বলে, “হয়তো পরে মেসেজ করবে।” এই ‘হয়তো’ শব্দটার ওপর ভর করেই কতদিন যে সে অপেক্ষা করেছে, তার হিসাব রাবিয়ার নিজের কাছেও নেই। কখনও কখনও সে পুরোনো মেসেজগুলো খুলে বসে। আগের কথাগুলো পড়তে পড়তে তার মনে হয়, মানুষ কি সত্যিই এতটা বদলে যেতে পারে? যে মানুষটা একসময় তার একটুখানি নীরবতাও সহ্য করতে পারত না, সে আজ তার দীর্ঘ নীরবতাটুকুও টের পায় না। যে মানুষটা একসময় বলত, “নিজের যত্ন নিও,” আজ সেই মানুষটার কাছেই রাবিয়ার ভালো থাকা না-থাকার কোনো গুরুত্ব নেই। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়টা হলো, রাবিয়া এখনও তোমার জন্য অপেক্ষা করে। সে জানে, অপেক্ষা করা উচিত নয়। জানে, বারবার একই মানুষকে খুঁজে নিজেকে কষ্ট দেওয়া ঠিক নয়। তবুও মন তো সবসময় যুক্তির কথা শোনে না। তাই প্রতিদিনের মতো আজও সে ফোনটা পাশে রেখে অপেক্ষা করে। হয়তো আজ আসবে একটা মেসেজ। হয়তো আজ তুমি আগের মতো করে কথা বলবে। হয়তো আজ বলবে, “আমি বদলে যাইনি।” কিন্তু রাত গভীর হয়ে যায়, ফোনের স্ক্রিন নিস্তব্ধ থাকে, আর রাবিয়ার অপেক্ষাটাও ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন তার মনে হয়, আঘাত পেলে মানুষ কাঁদে, কষ্ট পায়, তারপর একসময় সেই আঘাতের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। কিন্তু যে মানুষটা আদরের আবরণে নিজের বদলে যাওয়া লুকিয়ে রাখে, তার দেওয়া কষ্টটা মেনে নেওয়া অনেক বেশি কঠিন। কারণ সেখানে শুধু কষ্ট থাকে না, থাকে অসংখ্য প্রশ্ন। থাকে পুরোনো কথাগুলোর সঙ্গে নতুন আচরণের অদ্ভুত এক সংঘর্ষ। রাবিয়া স্পষ্ট শত্রুতাও হয়তো মেনে নিতে পারত। কেউ তাকে পছন্দ না করলে সরাসরি বলুক, কেউ তার সঙ্গে থাকতে না চাইলে চলে যাক—কষ্ট হলেও সত্যিটা অন্তত পরিষ্কার থাকবে। কিন্তু লোক দেখানো মায়া, মিথ্যে যত্ন আর ভালোবাসার নামে করা নাটক তার সহ্যসীমার বাইরে। সে মিথ্যে আশ্বাসের চেয়ে কঠিন সত্যিকে বেশি পছন্দ করে। কারণ সত্যি যতই কষ্টের হোক, অন্তত সেখানে প্রতারণা থাকে না। জানালার পাশে বসে রাবিয়া আবার ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে তোমার নাম নেই। শেষ মেসেজটাও সেই আগের। তার আঙুলটা কিছুক্ষণ চ্যাটবক্সের ওপর থেমে রইল। অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করল—“কেন বদলে গেলে?”, “আমি কি সত্যিই এতটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলাম?”, “সেই প্রথম দিনের মানুষটা কোথায় হারিয়ে গেল?” কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই লেখা হলো না। রাবিয়া শুধু ফোনটা বন্ধ করে রাখল। তার চোখের সামনে তখনও ভেসে উঠছিল সেই প্রথম দিনের তুমি। আর মনে হচ্ছিল, হয়তো মানুষকে হারানোর আগে মানুষটা বদলে যায়; শুধু আমরা সেটা বুঝতে একটু দেরি করি। রাবিয়া নূরও বুঝতে দেরি করেছে। খুব দেরি। কিন্তু আজ সে একটা সত্যি বুঝতে শুরু করেছে—ভালোবাসা শুধু কাউকে নিজের করে পাওয়ার নাম নয়; কখনও কখনও ভালোবাসা হলো এমন একজনকে চুপচাপ ছেড়ে দেওয়া, যে একসময় নিজেই তোমাকে তার জীবনে আসার জন্য অনুরোধ করেছিল।