শেষবার তুমি আমাকে বুঝাইলা, আমি তোমার কাছে কিছুই না!
রাত তখন অনেক হইয়া গেছে। ফোনের স্ক্রিনে তোমার পাঠানো শেষ মেসেজটা বারবার পড়তেছিলাম। কথাগুলা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু প্রতিটা শব্দ আমার বুকের ভেতরে আলাদা একটা ব্যথা তৈরি করতেছিল।
"তুমি আমাকে এতটা গুরুত্ব দিও না।"
হয়তো কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু আমার কাছে এর মানে ছিল অনেক গভীর।
অনেক সময় মানুষ সরাসরি বলে না যে তুমি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। তারা তাদের ব্যবহার দিয়াই সেটা বুঝাইয়া দেয়। আর সেদিন তুমিও ঠিক সেই কাজটাই করছিলা।
জানো, আমি কখনো তোমার কাছে বেশি কিছু চাই নাই। তোমার একটু সময়, কয়েকটা কথা আর সামান্য গুরুত্ব—এইটুকুই তো চাইছিলাম।
কিন্তু সেদিন মনে হইল, আমি যেন তোমার জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশই না। আমি শুধু এমন একজন, যারে তুমি চাইলে মনে রাখো, আর না চাইলে সহজেই ভুলে যাও।
তোমার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের দিনগুলা আমার এখনও মনে আছে। তখন প্রতিটা সকাল শুরু হইত তোমার একটা মেসেজের অপেক্ষায়। আর প্রতিটা রাত শেষ হইত তোমার সঙ্গে কথা কইয়া।
ধীরে ধীরে তুমি আমার অভ্যাসে পরিণত হইলা। তোমার হাসি আমার ভালো থাকার কারণ হইয়া উঠল। তোমার মন খারাপ থাকলে আমারও মন খারাপ হইত।
কিন্তু আমি বুঝতে পারি নাই, যে সম্পর্কটারে আমি এতটা গুরুত্ব দিতেছিলাম, সেই সম্পর্কটার মূল্য তোমার কাছে হয়তো কখনোই এতটা ছিল না।
সেদিন আমি অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইছিলাম। বলতে চাইছিলাম, "আমি কি সত্যিই তোমার কাছে এতটাই অপ্রয়োজনীয়?"
কিন্তু প্রশ্নটা আর করা হয় নাই।
কারণ উত্তরটা আমি আগেই পাইয়া গেছিলাম।
তুমি যখন আমার মেসেজের উত্তর দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিতে শুরু করলা, তখন আমি নিজেকে বুঝাইছিলাম যে তুমি হয়তো অনেক ব্যস্ত।
তুমি যখন আগের মতো আমার খোঁজ নেওয়া বন্ধ কইরা দিলা, তখনও আমি তোমারে দোষ দেই নাই।
তুমি যখন আমার অনুভূতিগুলারে গুরুত্ব না দিয়া এড়াইয়া যাইতে শুরু করলা, তখনও আমি তোমার পক্ষই নিছিলাম।
কিন্তু একটা সময়ের পরে মানুষ আর নিজেকে মিথ্যা কথা বুঝাইতে পারে না।
সত্য একদিন সামনে আসেই।
আর সেই সত্যটা হইল, আমি তোমার কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলা ভাবতাম, আসলে ততটা কখনোই ছিলাম না।
সেদিন রাতে আমি আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া নিজেকেই প্রশ্ন করছিলাম।
ভুলটা আসলে কোথায় ছিল?
আমি কি খুব বেশি ভালোবাসছিলাম?
নাকি খুব বেশি বিশ্বাস করছিলাম?
হয়তো দুইটাই।
আমরা অনেক সময় ভুল মানুষরে নিজের পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বানাই ফেলি। তারপর একদিন যখন সেই মানুষটা আমাদের গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ কইরা দেয়, তখন মনে হয় পুরো পৃথিবীটাই বদলাইয়া গেছে।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট তখনই লাগে, যখন প্রিয় মানুষটা তোমারে সরাসরি অপমান করে না, কিন্তু তার ব্যবহার তোমারে বুঝাইয়া দেয় যে তুমি তার কাছে বিশেষ কেউ না।
শেষবার তুমি আমাকে ঠিক এই অনুভূতিটাই দিছলা।
তুমি আমাকে বুঝাইয়া দিছলা যে আমার থাকা বা না থাকা তোমার জীবনে কোনো বড় পরিবর্তন আনে না।
সেদিন আমি কাঁদি নাই।
অন্তত তোমার সামনে না।
কারণ আমি চাই নাই, তুমি আমার দুর্বলতা দেখো।
আমি শুধু চুপচাপ একটা সিদ্ধান্ত নিছিলাম।
আর কখনো নিজেকে এতটা ভাঙতে দিব না।
কারও ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নিজেকে ছোট করব না।
কারও কাছে গুরুত্ব পাওয়ার জন্য নিজের সম্মান বিসর্জন দিব না।
তারপরও একটা কথা সত্যি।
আমি তোমারে পুরোপুরি ভুলতে পারি নাই।
আজও মাঝে মাঝে তোমার কথা মনে পড়ে।
কিছু গান শুনলেই পুরোনো স্মৃতিগুলা আবার ফিরে আসে।
কখনো কখনো মনে হয়, যদি সবকিছু অন্যরকম হইত!
কিন্তু পরে নিজেকে মনে করাই, কিছু মানুষ আমাদের জীবনে থাকার জন্য আসে না।
তারা আসে কিছু শিক্ষা দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য।
তুমি আমাকে শিখাইছো, কাউরে ভালোবাসার আগে নিজেকে ভালোবাসতে হয়।
তুমি আমাকে শিখাইছো, নিজের মূল্য কখনো অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া উচিত না।
আর সবচেয়ে বড় কথা, তুমি আমাকে শিখাইছো যে সব সম্পর্কের শেষটা সুন্দর হয় না।
তাই আজ আর কোনো অভিযোগ নাই।
কোনো অভিমানও নাই।
শুধু একটা কথাই বারবার মনে পড়ে—
"শেষবার তুমি আমাকে বুঝাইলা, আমি তোমার কাছে কিছুই না।"
আর সেই মুহূর্তেই আমি বুঝতে পারছিলাম, মানুষকে হারানোর চেয়ে নিজের আত্মসম্মান হারানো অনেক বেশি কষ্টের।
তাই আজ আমি নিজেকে নতুন করে গড়তেছি।
কারণ আমি জানি, আমি কারও কাছে কিছু না হইলেও, নিজের কাছে আমি অনেক কিছু।