তিতাস একা দাঁড়িয়ে থাকে ঘরের মাঝখানে। আলমারিটা খুলে নীল শাড়িটার দিকে তাকায় সে। শাড়ির ভাঁজে যেন ওর সব ইচ্ছেগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে।
কাল রাস্তায় সেই অচেনা লোকটা কেমন জোর গলায় আমাকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর কথা বলছিল! আর আমি? নিজের বাড়িতে একটা ছোট্ট 'না' বলার সাহস পাই না। আমার মতো ভীতু মেয়ের কপালে যে কী আছে কে জানে! তিতাস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাড়িটা হাতে তুলে নেয়।
বসার ঘরের মাঝখানে নীল সিল্কের শাড়িটা পরে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে তিতাস। শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচিয়ে ধরে আছে, যেন ওটাই ওর একমাত্র খড়কুটো। ওর ঠিক উল্টোদিকে সোফায় বসেছে পাত্রপক্ষ।
ছেলেটি, যার নাম কৌশিক, একদৃষ্টে মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা অনবরত স্ক্রোল করে চলেছে। যেন এবিষয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই। বা থাকলেও এই ঘটনাগুলোতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তার বাবাও বেশ চুপচাপ, শুধু মাঝে মাঝে ঘাড় নাড়ছেন আর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। তবে, পুরো আসরের রাশটা শক্ত হাতে ধরে আছেন কৌশিকের মা, বাসন্তী দেবী।
"তা মা তিতাস, একটু উঠে দাঁড়াও তো দেখি। হেঁটে দেখাও তো ওই দিক থেকে এই দিক পর্যন্ত।" বাসন্তী দেবীর মুখে মেকি হাসি। কিন্তু মুখে-চোখে অভিমানী।
কথাটা শুনে তিতাস চমকে ওঠে। ওর বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। এ কেমন কথা! আমি কি কোনো শো-পিসের পুতুল নাকি যে হেঁটে দেখাতে হবে? নাকি কোনো হাটের কেনা-বেচার জিনিস! তিতাস অসহায়ভাবে নিজের বাবা-মায়ের দিকে তাকায়। সুতপা দেবী চোখ পাকিয়ে, ভ্রু কুঁচকে ইশারা করেন উঠতে।
তিতাস বুঝতে পারে এখানে তার মতামতের কোনো দাম নেই। সে বাধ্য হয়ে ওঠে। পা দুটো যেন সীসার মতো ভারী লাগছে। বুকের ভেতরটা অভিমানে টনটন করছে। সে কোনোরকমে দু'পা হেঁটে আবার নিজের জায়গায় এসে বসে পড়ে।
বাসন্তী দেবী একটু নাক সিঁটকে বলেন, "হুম, তা হাঁটাচলা ঠিক আছে। তবে হাইটটা একটু কম মনে হচ্ছে, না? এই ধরো, পাঁচ ফুট মতো হবে বোধহয়। আমাদের কৌশিক তো আবার বেশ লম্বা চওড়া। মানাবে কি?"
ভবতোষবাবু তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন, "আরে বেয়াইন, মানে, দিদিভাই, হাইট নিয়ে ভাববেন না। মেয়েরা তো একটু খাটো হলে ভালো মানায় ছেলেদের সাথে।"
'বাবা, তুমিও! আমার উচ্চতা নিয়ে এই মহিলা হাসাহাসি করছেন, আর তুমি ওনার কথায় সায় দিচ্ছ?' তিতাস নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে, ওর চোখের কোণে জল জমতে শুরু করেছে। এই বাড়িতে কি তার নিজস্ব কোনো সম্মান নেই?
"তা সে যাই হোক," বাসন্তী দেবী আবার শুরু করেন, "মাথাটা একটু তোলো তো মা। দেখি তোমার চুলটা কেমন। আজকালকার মেয়েরা তো সব চুল কেটে ছোট করে ফেলে। আমাদের বাড়িতে কিন্তু ওসব চলবে না। বড় চুলই আমাদের পছন্দ।"
তিতাস আস্তে আস্তে মাথা তোলে। ওর পিঠ ছাপানো ঘন কালো চুলটা আজ সুন্দর করে খোলা রাখা হয়েছে।
"হ্যাঁ, চুলটা ভালো। তা রান্নাবান্না কেমন জানো? আমাদের কৌশিক কিন্তু বড্ড খাওয়ার শৌখিন। রোজ নতুন নতুন ডিশ খেতে ভালোবাসে। তুমি কি ওর খেয়াল রাখতে পারবে?"
"হ্যাঁ হ্যাঁ, তিতাস সব পারে। ও খুব ভালো রান্না করে," সুতপা দেবী তাড়াতাড়ি উত্তর দেন।
বাসন্তী দেবী কেবল মুখ বাকিয়ে হাসেন। "সে তো মায়ের কাছে সবাই ভালো রান্না করে। আসল পরীক্ষা তো শ্বশুরবাড়িতে। আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা। মেয়ে তো দেখছি একটু... মানে, বেশ স্বাস্থ্যবতী। বিয়ের পর তো আরও মোটা হয়ে যাবে। আমাদের কৌশিক কিন্তু বেশ ফিট। ও কি এইরকম... মানে, একটু ভারিক্কি চেহারার মেয়েকে পছন্দ করবে? না মানে, একটু জিমে যাক। রোজ সকাল হাঁটাচলা করুক।"
বাসন্তী দেবী কথাগুলো বলছেন হাসতে হাসতে, যেন খুব মজার কোনো জোকস শোনাচ্ছেন। কিন্তু তিতাসের মনে হচ্ছে কেউ যেন ওকে চাবুক মারছে।
'কী বলছেন উনি? আমি মোটা? হ্যাঁ, আমি একটু কার্ভি হতে পারি, কিন্তু তাই বলে উনি মুখের ওপর এভাবে বডি শেম করবেন? আর মা-বাবা চুপ করে শুনছে! কেউ একটা প্রতিবাদ করছে না!' তিতাস নিজের হাতের মুঠি শক্ত করে। নখগুলো হাতের তালুতে বসে যাচ্ছে।
"আরে না না, দিদিভাই," সুতপা দেবী একটু কাঁচুমাচু হয়ে, প্রায় অপরাধীর মতো বলেন, "বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। তিতাস ডায়েট কন্ট্রোল করলে স্লিম হয়ে যাবে। ও খুব লক্ষ্মী মেয়ে, সব মানিয়ে নেবে।"
'মা! তুমিও আমার সাথে এমন করছ? তুমি তো জানো আমি ডায়েট করতে পারি না, আমার শরীর খারাপ হয়। আর আমি কেন মানিয়ে নেব? কেন নিজের শরীরটাকে ওদের ইচ্ছেমতো বদলাতে হবে? আমার কি নিজের কোনো সত্তা নেই?' তিতাসের দম আটকে আসে। চোখের জলটা কোনো মতে আটকে রাখে।
কৌশিক একবার মোবাইল থেকে চোখ তুলে তাকায় তিতাসের দিকে। তিতাসের মনে একটা ক্ষীণ আশা জাগে, হয়তো এবার ছেলেটা কিছু বলবে। কিন্তু না, কৌশিক সম্পূর্ণ নির্বিকারভাবে আবার মোবাইলে ডুবে যায়। ওর মায়ের বলা অপমানজনক কথাগুলো যেন ওর কানে ঢুকছে না।
'এই ছেলের হাতে আমাকে তুলে দিতে চাইছ তোমরা? যে ছেলে নিজের মায়ের অন্যায় কথার প্রতিবাদ করতে পারে না, একটা মেয়েকে চোখের সামনে অপমানিত হতে দেখেও চুপ থাকে, সে কি আমার কোনোদিন সম্মান করবে?' তিতাসের বুকের ভেতরের কান্নাটা এবার গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠে।
গতরাতের অজানা লোকটার কথা বার বার কানে গুঞ্জন করছে তিতাসের। তার ইচ্ছে করছে এখনই উঠে গিয়ে তাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। কান্নায় দম বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম। চোখ ছলছল করছে। এতো মানুষ সামনে কিন্তু কেউ তাকে মানুষ হিসেবে দেখছেনা।
নিজের ঘরে আয়নার সামনে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিতাস। তাদের চলে যাবার পর থেকে সে নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
কী কমতি আছে আমার চেহারায়? শুধু বাহ্যিক গঠন দেখে কারো বিচার করা যায়? আমার নিজের সত্তা, সেটার কোনো মূল্য নেই? আমি ভালো গান করি, প্রাইজ নিয়েছি। বাচ্চাদের পড়াই। নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে সক্ষম। এগুলোর কোনো দাম নেই? শুধু চেহারা? হ্যাঁ, আমি হয়তো বিজ্ঞাপনের মডেলদের মতো ছিপছিপে নয়, কিন্তু তাই বলে আমি কি বিশ্রী? আমার কি কোনো আত্মসম্মান থাকতে নেই?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অবাধ্য চুলগুলোকে টেনে শক্ত করে একটা খোঁপা বাঁধে সে। কাল একটা ইনস্টিটিউটে চাকরির ইন্টারভিউ আছে। মনটা কোনোভাবে খারাপ হতে দেওয়া যাবে না। ঘরের লাইট বন্ধ করে সে বিছানায় শুয়ে পরে। চোখ বুঝে শুধু ভাবে, আমার জীবনটা কী এভাবে কেটে যাবে? আমি কী চিরকাল নীরব থেকে যাবো?
ভোরবেলা জেগে যায় তিতাস। কয়েক ঘন্টা পর ইন্টারভিউ। আলমারি থেকে একটা ঢিলেঢালা, আরামদায়ক টি-শার্ট আর কালো ট্র্যাকপ্যান্ট বের করে গায়ে গলিয়ে নেয় সে। ইন্টারভিউতে যাওয়ার আগে মন আর মেজাজটাকে শান্ত করতে কিছুটা সময় বাইরে থেকে হেঁটে আসা খুব দরকার।
ভোর কেবল পাঁচটা। মা-বাবা নিজেদের ঘরে শুয়ে। গতকাল বিকেলের পর থেকে ওনারা তিতাসের সাথে একটা কথাও বলছেন না। ওনাদের হাবভাব এমন, যেন পাত্রপক্ষের আচরণের জন্য তিতাস সম্পূর্ণভাবে দায়ী!
এখন ওনারা ঘুমে কাদা। আর এই সুযোগে পা টিপে টিপে সদর দরজা খুলে রাস্তায় বেরিয়ে আসে তিতাস।
পাড়ার মোড়ের মাঠটায় রোজকার চেনা মুখগুলো বসে আড্ডা মারে। তাদের বাঁকা চাউনি আর ফিসফাসানি এড়াতে আজ তিতাস অনেকটা দূরের চিলড্রেনস পার্কে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অহেতুক কারও ফালতু মন্তব্য শুনে আজকের দিনটা আর মাটি করার কোনো ইচ্ছে তার নেই।
প্রায় কুড়ি মিনিট টানা হাঁটার পর পার্কের লোহার গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকে তিতাস। কানে হেডফোন, ফুল ভলিউমে গান চলছে। বাইরের পৃথিবীর কোলাহল থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে নিতে চায় সে। হাঁটতে হাঁটতে ওর চোখ যায় একটা ছোট লাল-নীল রঙের স্লিপার আর দোলনার দিকে। পাড়ার পার্ক হলেও এই জায়গাটা একদম শুনশান। কোথাও একটা কাকপক্ষীও নেই।
পার্কের মূল অংশ থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা ছোট্ট পুকুর। জলে কোনো হাঁস নেই, জলটা বেশ ঘোলাটে। জায়গাটা বড্ড শান্ত আর ছায়াময়। সাধারণত এদিকে কেউ আসে না। তিতাস হেডফোনের ভলিউমটা আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে পুকুর পাড়ের সরু মাটির রাস্তাটা দিয়ে আনমনে হাঁটতে থাকে।
হঠাৎ জলের ধারে ফুটে থাকা একটা একা লাল শালুক ফুলের দিকে চোখ আটকে যায় ওর। ফুলটা বড্ড সুন্দর! চারপাশের আগাছা আর ঘোলা জলের মাঝেও কেমন মাথা উঁচু করে নিজের সৌন্দর্য জানান দিচ্ছে। তিতাস আরেকটু ভালো করে দেখার জন্য পাড়ের একদম ধারের দিকে ঝুঁকে দাঁড়ায়। কিন্তু আনমনা থাকায় সে খেয়াল করে না পাড়ের ওই দিকটায় পুরু শ্যাওলা জমে জায়গাটা কতটা পিছল হয়ে আছে।
পা-টা একটু এগোতে তিতাস বুঝতে পারে সে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলছে। পায়ের তলার মাটি যেন হড়কে যায়! সোজা পুকুরের ঘোলা জলের দিকে ছিটকে পড়ছে ও! ওর যে সাঁতার জানা নেই!
ভয়ে গলা দিয়ে অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে আসে। বাঁচার কোনো উপায় না দেখে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে সে।
কিন্তু জলে পড়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে পেছন থেকে কেউ একজন ওর টি-শার্টের কলারটা খপ করে টেনে ধরে। টানটা এতই জোরালো আকস্মিক, তিতাস সোজা পেছন দিকে ছিটকে এসে একটা শক্ত, পাথরের মতো চওড়া বুকে সজোরে আছড়ে পড়ে। ধাক্কার চোটে হেডফোনটা কান থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে যায়।
"এমনি বলিনি তোমার চোখদুটা বাড়ির আলমারিতে! কোনো না কোনো ভাবে বিপদে পড়বেই পড়বে।"
চেনা, গম্ভীর বাজখাঁই গলাটা শুনে তিতাস ধড়ফড় করে লোকটার বুক থেকে সরে দাঁড়ায়।
'লোকটা এখানেও?'