Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

তিতাস নদী - পর্ব 4

রুদ্র তিতাসকে চোখের ইশারায় অটোতে উঠতে বলে। তিতাস কথা না বাড়িয়ে গুটিগুটি পায়ে অটোতে গিয়ে বসে। ছাতাটা বন্ধ করে পাশে রাখে।

"শোনো, অটোতে বসে আগে বাড়িতে ফোন করে জানাও যে তুমি অটো পেয়ে গেছ। যাতে ওনারা চিন্তা না করে।"

একটু থেমে রুদ্র আবার বলে, "আর রাস্তায় যদি কোনো সমস্যা হয়, বা ভয় লাগে, আমাকে ফোন করে নিও।" বলে রূদ্র ভুরু তুলে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করে তিতাসকে। 'আশাকরি মেয়েটা বুঝতে পারছে। দেখে তো মনে হচ্ছে না যদিও।'

তিতাস বুঝতে পারে, এটা রুদ্রর একটা চাল। তাকে নিরাপদ রাখতে এই অভিনয়টা করতে বলছে লোকটা। সে শুধু বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
অটোটা স্টার্ট নেয়। হুস করে রাতের অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে যায় শ্যামবাজারের দিকে।

রুদ্র রাস্তার ধারে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। অটোটা চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার পর তার ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসিটা আবার ফুটে ওঠে। ভিজে যাওয়া অবাধ্য চুলগুলোতে একবার হাত চালিয়ে সে রাতের নিস্তব্ধতায় নিজের মনে বিড়বিড় করে ওঠে, "পাগলি একটা!"


প্রায় এক ঘন্টা পর, বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে রুদ্র। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। শুকনো তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে নিজেকে দেখছে। 

সেসময় বিছানায় রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করে ওঠে। স্ক্রিনে একটা আননোন নম্বর। মেসেজটা খুলতে রূদ্র আওয়াজ করে হাসে। 

অটোওয়ালা কথা রেখেছে। মেসেজে শ্যামবাজারের একটা নির্দিষ্ট লোকেশনের ছবি, আর নিচে টাইপ করা, "দাদা, দিদিমণিকে বাড়ির গেটে নামিয়ে দিয়েছি। চিন্তা করবেন না।"

রুদ্র একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। এক ঘণ্টা হয়ে গেল মেয়েটাকে গাড়িতে তুলে দিয়েছে, এতক্ষণ মনের এক কোণে সূক্ষ্ম একটা কাঁটা খচখচ করছিল। তবে একটা চাপা অভিমানও যে কাজ করছে না, তা নয়। 

'ভীতু খরগোশটা নিজে থেকে তো একবার নাম্বারটা চেয়ে নিয়ে বলতে পারত যে সে ঠিকঠাক পৌঁছেছে! তা নয়, সব দায়িত্ব যেন আমার একার!' পরক্ষণে নিজের ভাবনায় নিজেই হেসে ফেলে রুদ্র। 'যাই হোক, মেয়েটা অন্তত নিরাপদে বাড়ি ফিরেছে, এটাই ঢের। আমার নম্বর চাওয়ার জন্য তার কাছে রিসন টাও তো লাগবে!''


নিচের ঘরে টিভিটা বেশ জোরে চলছে। খবর শেষ হয়ে এখন স্পোর্টস সেগমেন্ট শুরু হয়েছে। ডাইনিং টেবিলের একমাথায় বসে একদৃষ্টে টিভির দিকে তাকিয়ে আছেন হরিশবাবু। সামনে ধোঁয়া ওঠা গরম রুটি আর চিকেন কষা।

"কী হলো বাবা? আজ আবার কার খেলা নিয়ে ময়নাতদন্ত চলছে?" রুদ্র একটা চেয়ার টেনে বাবার মুখোমুখি বসে পড়ে।

হরিশবাবু ছেলের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার টিভিতে চোখ ফেরান। "আর বলিস না! মোহনবাগানের ডিফেন্সটার যে কী হাল হয়েছে! ওই বিদেশি স্টপারটাকে তো দেখে মনে হচ্ছে পায়ে বাত ধরেছে। বল ক্লিয়ার করবে কী, নিজেই তো পড়ে যাচ্ছে!"

রুদ্র মুচকি হাসে। "আরে বাবা, শুধু ডিফেন্সকে গালমন্দ করে কী হবে? মাঝমাঠ থেকে বলের জোগানটা তো নেই। তুমি শুধু ডিফেন্ডারদের দোষ দিচ্ছ, কিন্তু যে মিডফিল্ডারটা বল হোল্ড করতে পারছে না, সেটা তো দেখছ না। ট্যাকটিক্যাল ফল্টটা তো কোচের।"

"তোর তো আবার সব বিষয়ে মাস্টার মশাইয়ের মতো জ্ঞান!" পেছন থেকে গরম রুটির হটবক্স হাতে নিয়ে আসেন সুজাতা দেবী। ছেলের পাতে দুটো রুটি আর এক বাটি চিকেন তুলে দিতে দিতে বলেন, "খেতে বসে বাপ-বেটায় ওই বল ঠেঙানোর গল্প একটু বন্ধ করবি? সারা দিন পর ছেলেটা বাড়ি ফিরল, তা না, ফুটবল নিয়ে তর্ক জুড়ে দিল!"

রুদ্র মায়ের হাতের ওপর আলতো করে একটা হাত রাখে। "আহ মা, তুমি আবার এর মধ্যে রেফারি হয়ে ঢুকছ কেন? বাবার তো ওই একটাই বিনোদন। আর তোমার হাতের চিকেন কষার গন্ধে তো মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল সব একাকার হয়ে যাচ্ছে!"

ছেলের কথায় সুজাতা দেবীর কপট রাগ নিমেষে গলে জল। "খালি মুখে মধু মাখানো! খা, চুপচাপ খেয়ে নে আগে। বড্ড শুকিয়ে গেছিস তুই।"

খাওয়া-দাওয়ার পর্বটা বেশ জমজমাট আড্ডার মধ্যে দিয়ে কাটে। খাওয়া শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে আসে রুদ্র। ঘড়িতে রাত এগারোটা ছুঁইছুঁই।

"গুড নাইট বাবা, গুড নাইট মা। আমি এবার ঘরে যাচ্ছি, কিছু কাজ বাকি আছে," রুদ্র নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়।

"বেশি রাত জাগবি না কিন্তু রুদ্র! কাল সকালে আবার উঠতে হবে," পেছন থেকে সুজাতা দেবীর চিরাচরিত শাসন ভেসে আসে।

"ঠিক আছে মা, জাগব না," পেছন না ফিরে রুদ্র জবাব দেয়। নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে অফিসের কাজ করতে বসে সে।

রুদ্রর ঘরটা একদম ছিমছাম, পরিপাটি। বইয়ের তাকগুলো সুন্দর করে গোছানো। কোথাও একবিন্দু ধুলো নেই। জানালায় বড়ো পর্দা ঝোলানো। একপাশের দেয়ালে মা বাবাকে নিয়ে ছবির মেলা। ঘরের মাঝে বড়ো গোল রাউন্ড বেড। বেডের দু'পাশে বেড টেবিল। ছোটো ছোটো বেডল্যাম্প তাতে রাখা। ঘরের সাথে লোগোয়া বাথরুম আর একপাশে ড্রেসিং টেবিল, আলমারি আর স্টাডি টেবিল। 


সে ধীর পায়ে নিজের স্টাডি টেবিলটার সামনে এসে বসে। ড্রয়ার থেকে একটা চশমা বের করে চোখে পরে। ল্যাপটপটা অন করতে স্ক্রিনের নীল আলোয় রুদ্রর মুখের গাম্ভীর্যটা আবার ফিরে আসে।

ল্যাপটপ স্ক্রিনে পাসওয়ার্ড দিয়ে লগ-ইন করতে একটা পোর্টাল খুলে যায়। ওপরের ডানদিকের কোণায় জ্বলজ্বল করছে ভারত সরকারের অশোকস্তম্ভের লোগো। পেশায় সে একজন উকিল। ক্রিমিনাল বিভাগের সেরা উকিল রুদ্র রায়। যার দাপটে সকলে মাথা নত করে।

আজকের পেন্ডিং ফাইলগুলো এক এক করে চেক করতে শুরু করে সে। আগামী সপ্তাহের একটা গুরুত্বপূর্ণ কেস আছে। সে বিষয়ে চোখ বুলিয়ে নেয় সে। চোখ দুটো স্ক্রিনে নিবদ্ধ, আঙুলগুলো কিবোর্ডে দ্রুত গতিতে চলছে। কাঁধের ওপর থাকা গুরুদায়িত্ব পালনে কোনো ত্রুটি রাখতে নারাজ সে।

বাইরে বৃষ্টির বেগ আবার বেড়েছে। জানলার কাঁচে জলের ফোঁটা আছড়ে পড়ছে। ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরায় রুদ্র। জানলার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই তার মনে ভেসে ওঠে একটা ভেজা ছাতা হাতে থাকা দুটো বড়ো বড়ো, ভয় পাওয়া চোখ।

'বড্ড অদ্ভুত মেয়েটা!'

মাথাটা দুদিকে নেড়ে রুদ্র আবার নিজের কাজে মন দেয়। সরকারি সার্ভারের জটিল দুনিয়ায় এখন আর অন্য কোনো ভাবনার জায়গা নেই।


পরদিন সকালে তিতাস চুপচাপ জানলার ধারের ইজিচেয়ারটায় বসে আছে। ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নখের কোণটা দাঁত দিয়ে খোঁটানো আবার শুরু করেছে। আজ সকাল থেকে ওর পেটের ভেতরটা কেমন গুলিয়ে উঠছে। গতকাল রাত্রে বাড়ি ফিরে তাকে যে এহেন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে সে তো কল্পনাতেও আনেনি।

"কীরে তিতাস, এখনও সুতির কুর্তিটা পরে বসে আছিস? তোকে না বললাম আলমারি থেকে নীল সিল্কের শাড়িটা বের করে রাখতে?"

সুতপা দেবী গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকলেন। হাতে একটা আধ-কাটা আপেলের প্লেট।

তিতাস চমকে নখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। "মা, আজ কি ওদের আসাটা খুব জরুরি? আমার না... মানে, মাথাটা একটু ব্যথা করছে।"

মাথা ব্যথা তো একটা বাহানা মাত্র! কিন্তু আসল কথাটা যে বুকের ভেতর কেমন পাথর হয়ে বসে আছে, সেটা তোমায় বোঝাব কী করে মা? আমি তো এখনই বিয়ে করতে চাই না। অন্তত মাস্টার্সটা তো শেষ করতে দাও! তিতাস মনে মনে ডুকরে ওঠে।

"ন্যাকামি করিস না তো তিতাস!" সুতপা দেবী আপেলের প্লেটটা টেবিলে ঠক করে রাখলেন। "পাত্রপক্ষ ঠিক বিকেল পাঁচটায় আসবে। ছেলে সল্টলেকে আইটিতে চাকরি করে, রাজারহাটে নিজেদের ফ্ল্যাট। এমন সম্বন্ধ হাতছাড়া করলে তোর বাবা আমাকে দুষবে সারাজীবন।"

ভবতোষবাবু চশমার কাঁচটা শার্টের খুঁটে মুছতে মুছতে ঘরে ঢোকেন ঠিক সেই সময়। "সুতপা, ওকে খামোখা বকছ কেন? তিতাস মা, একটু ভালো করে সেজেগুজে নিস কিন্তু আজ। ছেলেটা বড্ড ভালো রে, বুঝলি? একদম জেনুইন। এই বাজারে এমন সোনার টুকরো পাত্র পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।"

তিতাস মাথা নিচু করে শুধুমাত্র অস্ফুট শব্দ করে, "হুম।"

সেই এক কথা! পাত্র ভালো, চাকরি ভালো, ফ্ল্যাট আছে। কিন্তু আমার যে স্বপ্নগুলো আছে, সেগুলোর কি কোনো দাম নেই এই বাড়িতে? আমি যে এই অচেনা মানুষগুলোর সামনে নিজেকে পুতুলের মতো সাজিয়ে বসিয়ে রাখতে ঘেন্না করি, সেটা কেউ কেন বোঝে না? তিতাসের গলার কাছটা দলা পাকিয়ে আসে।

সুতপা দেবী মেয়ের কাছে এগিয়ে এসে ওর চিবুকটা ধরে মুখটা একটু উঁচুতে তোলেন। "আর শোন, ওদের সামনে গিয়ে আবার মুখচোরা স্বভাবটা দেখাস না যেন। ছেলে যদি কিছু জিজ্ঞেস করে, হাসিমুখে স্মার্টলি উত্তর দিবি। একদম ঘাড় গুঁজে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবি না।"

"মা, আমি তো স্মার্ট নই, তুমি জানো। ওরা যদি আমাকে অপছন্দ করে?" তিতাসের গলায় হালকা কাঁপুনি, সাথে একটা সুপ্ত আশা যদি ওরা ওকে রিজেক্ট করে দেয়!

"মা দুর্গার নাম নিয়ে সামনে যাবি, সব ঠিক হবে। এমন লক্ষ্মী প্রতিমার মতো মেয়েকে অপছন্দ করার কোনো কারণ নেই। যা, তাড়াতাড়ি রেডি হ।" সুতপা দেবী আর কোনো কথার সুযোগ না দিয়ে স্বামীকে তাড়া দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।