Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

তিতাস নদী - পর্ব 3

রুদ্র সবে মাত্র সামনে পা বাড়িয়েছে। তিতাসের কথা শুনে থমকে দাঁড়ায়। পেছন ঘুরে সে সামান্য হাসে।

ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, "ওহ! তাহলে কথা বলতে পারো দেখছি! যাক, গলা দিয়ে অন্তত আওয়াজ বেরোয় তাহলে। আমি তো ভাবলাম বোবা-টোবা নাকি! তা এই গলাটা এতক্ষণ কোথায় ছিল? বিকাশ যে টিজ করছিলো আপনাকে সেটা নিশ্চই বুঝতে পেরেছেন! তাহলে টু শব্দ করলে না কেন?"

তিতাস ঘাবড়ে এদিক -ওদিক দেখে। 'কী বলবো আমি? পারি না তো! লোকের সামনে গেলে ঠান্ডা হয়ে আসে হাত-পা। কী বলবো বুঝি না। ভয় করে আমার।'

তিতাসকে চুপ করে থাকতে দেখে রুদ্র মাথা নাড়ে। সে একপ্রকার ডিসাপয়েন্টেড। অন্তত এখন সে ভেবেছিলো তিতাস তার জবাব দেবে। তিতাসের দিকে পিঠ দিয়ে সে আবার হাঁটতে শুরু করে। 

"চলো। খেয়ে ফেলব না আমি। ফোন নম্বর বা ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল চাচ্ছি না। রাত্রি হতে চলছে। বৃষ্টি বাদলের দিন। টোটো অটো পাওয়া মুশকিল। তাই বাড়ি পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করছি কেবল।"

"আমি... আমি চলে যাবো। আমাকে ছাড়তে হবে না।"

রুদ্র বিরক্তিতে কপালের ওপর এসে পড়া ভিজে চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনের দিকে সরিয়ে দেয়। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ায় তিতাসের দিকে।

অন্ধকার আর বৃষ্টির আবছায়ার মধ্যে রুদ্রর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একবার ভালো করে মেপে নেয় তিতাসকে। ছাতার তলায় মেয়েটার মুখটা বড্ড মায়াবী। বৃষ্টির ছাঁটে সামনের কয়েকটা চুল কপালে আর গালে লেপটে আছে। টানা টানা দুটো চোখ, যেগুলোতে এখন রাজ্যের ভয়, আর জল জমে আছে। মেয়েটা দেখতে যে বেশ সুন্দর, সেটা রূদ্রর চোখ এড়ায়নি। কিন্তু এই অতিরিক্ত ভীতু, গুটিয়ে থাকা স্বভাবটা তাকে বিগড়ে দিচ্ছে। রূপ আছে কিন্তু তেজ নেই একবিন্দু! তবুও, এই কাঁপতে থাকা মেয়েটাকে নিয়ে একটা অজানা কৌতূহল উঁকি দেয় রুদ্রর মনে।

"শোনো ম্যাডাম..তোমাকে পাম দেওয়ার কোনো ইচ্ছে বা সময় আমার নেই। আমি তোমাকে কোলে তুলে তোমার বাড়ির বেডরুমেও দিয়ে আসতে যাচ্ছি না। মেইন রোড অবধি ছেড়ে দিচ্ছি, তারপর অটো বা টোটো যা পাবে উঠে নিজের রাস্তা দেখবে।"

তিতাসের এবার সত্যি সত্যি রাগ হয়। 'লোকটার কথা বলার ধরনটা বড্ড রুক্ষ! মানুষ এমন কাঠখোট্টা হয় কী করে! আমি কী বলেছি আমাকে বাঁচাতে? বাঁচানোর পর যদি এতো কথা শুনতে হয় তাহলে তার থেকে না-ই আসতো।'

তিতাস ভুরু কুঁচকে রুদ্রকে অনুসরণ করে। তবে মুখে কিছু বলে না। রুদ্র একবার পেছনে তাকিয়ে আবার সামনে ফেরে। "এই সন্ধেবেলায়, রাস্তায় একা কী করছিলে? শর্টকাট মারার খুব শখ না? রাস্তাটা যে সেফ নয়, সেটা জানা নেই?"

তিতাস জেদ করে মুখ ফিরিয়ে নেয়। 'বলবো না আমি।'

"বাহ্! একটা সামান্য প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছোনা?" 

"আমি টিউশন পড়িয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। বাস পাচ্ছিলাম না বলে..." 

"হুম! অমনি শর্টকাট নিলে, কী তাই তো? মানে, অদ্ভুত মেয়ে বটে তুমি! এমন বৃষ্টির রাত্রে এধরণের গলি কে নেয়? বাই চান্স যদি আমি না থাকতাম আজকে কী করতে? ওই ছাতাটা দিয়ে ওকে পেটাতে? ও, তুমি তো আবার বোধজ্ঞান ছাড়া মেয়ে। কথাই বলোনা, পেটানো তো দূরের কথা!"

'আশ্চর্য!! অপমানের ওপরে অপমান করে চলছে। কিছু বলছি না বলে কী যা তা বলে চলবে!'

রুদ্র কখন পায়ের গতি কমিয়ে তিতাসের সাথে তাল মিলিয়ে হাটছে দুজনের কেউ লক্ষ্য করেনি। তিতাস মুখগোমড়া করে ছাতা নিয়ে চলছে। রুদ্র বৃষ্টিতে চুপচুপে ভিজে।  

"বাড়ি কোথায় বললে না তো!"

"শ্যামবাজার..." তিতাস খুব আস্তে উত্তর দেয়।

"বেশ! শ্যামবাজার যাবে অথচ এখন বাঘাযতীনে।"

তিতাস জবাব দেয় না।

গলির পথটা বেশ এবড়োখেবড়ো, তার ওপর বৃষ্টির জলে কাদা প্যাঁচপ্যাঁচ করছে। তিতাস এক হাতে ছাতা সামলে, অন্য হাতে সালোয়ারের কোণ বাঁচিয়ে কোনোমতে এগিয়ে চলছে। তার টেনশন বেশি রাত করে ফিরলে মায়ের বকুনি শুনতে হবে। আজকে যা শুনেছে তাতে তার লাইফটাইম কোটা পূরণ হয়ে গেছে। আর শোনার ইচ্ছে নেই। 

হঠাৎ রাস্তার ধারের একটা ছোট গর্তে পা পড়ে তিতাসের। অমনি পা উল্টে যায়। মুখ ফসকে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে আসে তার, "উফ!" ব্যথা পাবার আতঙ্কে সঙ্গে সঙ্গে তিতাস চোখ বন্ধ করে নেয়। কিন্তু যখন দেখে উল্টে পড়ে নি, সে চোখ মেলে তাকায়। রুদ্র তিতাসের বা হাত জাপ্টে ধরেছে। 

তিতাসকে বাঁচাতে গিয়ে রুদ্র প্রায় তিতাসকে নিজের কাছে টেনে নিয়েছে। দুজনের মধ্যে দূরত্ব এখন সামান্য। হাওয়া যাতায়াত করার মতো উপায় নেই। তারা এতটাই কাছে দুজনে দুজনের হৃদয়ের আওয়াজ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছে। তিতাস দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে। তার হৃদপিন্ড বাইরে বেরিয়ে পরার উপক্রম। তবে যে বিষয়ে তিতাস অবাক, তা.... যেমনটা তার মন ছুটছে সেমনি রুদ্রর বুকের দ্রুত গতি তিতাস অনুভব করতে পারে। 

কয়েক মিনিট কেটে যায়। রুদ্র তিতাসকে ধরে রাখে। তিতাস রুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। দুজনের কেউ সরার প্রয়াস করে না। যেন সময় তাদের জন্য থেমে গেছে। এমন সময় ছাতাটা টলে চোখে মুখে জল পড়লে তিতাসের হদিস আসে সে রূদ্রর কতটা নিকট। লজ্জায় সে খানিকটা পিছিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। রুদ্র যখন দেখলো তিতাস হোঁচট খেয়ে দ্বিতীয়বার পরবে না, তখন তিতাসের হাতটা সে ছেড়ে দেয়। তিতাসের পাশে আসাটা যে রূদ্রর ওপর প্রভাব ফেলে নি, সেটা ভুল। কিন্তু রুদ্র নিজের ইমোশন কন্ট্রোল করতে জানে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রুদ্র আবার মেজাজ দেখায়। "না। তোমার চাল ঢাল ঠিক নেই। এভাবে ধুপাশ ধাপাশ করে পড়লে রাস্তায় চলবে কী করে?"

তিতাসের সারা শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। গায়ের লোমকূপ খাড়া হয়ে পড়ে। এমনিতে লোকটার কাছাকাছি আসায় তার বুকটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে, তার ওপর আবার একই ধমক! থামার নাম করে না।

"আ... আমি... গর্তটা খেয়াল করিনি..."

"খেয়াল তো তুমি পৃথিবীর কোনো কিছু করো না দেখছি! রাস্তায় বখাটে ছেলে আটকালে খেয়াল করো না, কাদা প্যাঁচপ্যাঁচে রাস্তায় গর্ত থাকলে খেয়াল করো না! স্বয়ং ভগবান তোমার সামনে থাকলে তাকে পেরিয়ে তুমি চলে যাবে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে, 'আমি তো খেয়াল করিনি' আশ্চর্য প্রাণী বটে তুমি! তা ম্যাডাম করেনটা কী?"

অপমানে চোখ দুটো আবার জ্বালা করে ওঠে তিতাসের। 'একয়েক মিনিটের আলাপে কতগুলো কটু কথা শোনালো। অন্ধকারে গর্ত দেখতে পারিনি বলে আমার দোষ! এনার প্রবলেমটা কী? সেই শুরু করেছে তো করেছেই। কপাল করেছি আজকে এই গলিটায় এসে। ভগবান তাড়াতাড়ি একটা টোটো পাঠাও আর আমাকে এনার থেকে মুক্তি দাও।'

"আপনি... আপনি আমাকে এখানে ছেড়ে দিন। আমি ঠিক চলে যাবো একা..."

"হ্যাঁ, একা গিয়ে সামনের খোলা নর্দমায় পড়ো! তারপর কাল সকালের খবরের কাগজে হেডলাইন: 'শ্যামবাজারের শিক্ষিকা বাঘাযতীনের ড্রেনে! একে তো নিজের ভালো বোঝো না, তার ওপর আবার ঘাড়ত্যাড়ামি! সোজা হাঁটতে পারে না, আবার বলে একা যাবো!"

তিতাস শুধু ছাতার তলা থেকে ড্যাবড্যাব করে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে রাগ হলেও প্রকাশ্যে আনে না।

"ওভাবে বড়ো বড়ো চোখ করে দেখার কিচ্ছু হয়নি। আমার ওসবে কিচ্ছু যায় আসে না, যেটা সত্যি সেটা আমি বলতে দ্বিধা করিনা। চুপচাপ আমার পিছনে পিছনে এসো। আর একবার যদি হোঁচট খেয়েছ, তো আমি কিন্তু রাস্তার মোড়েই ফেলে রেখে চলে যাবো। সোজা কথা!"

'তাহলে যান! আপনাকে আমি আটকে রাখিনি।'

রুদ্র পেছন ফেরে তিতাসের চোখে চোখ রাখে। "কিছু বললে?"

"কোথায়? না তো!"

"হুম। বলবেই বা কেন! তোমার তো আবার লিমিটেড এডিশন।"

তিতাস মুখ হা করে তাকিয়ে থাকে। 'আচ্ছা ট্যারা লোক দেখি!'

রুদ্র আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না। হনহন করে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। তিতাস বুঝতে পারে এই রগচটা লোকটার সাথে সে পার মেলাতে পারবে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ছাতাটা একটু উঁচু করে, সাবধানে কাদা বাঁচিয়ে পা ফেলে রুদ্রকে অনুসরণ করে হাঁটতে থাকে। গলির নিকষ অন্ধকারে আর বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে দুজনের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে আসে, শুধু রুদ্রর ভারী বুটের শব্দ আর তিতাসের নীরব পায়ের আওয়াজ ছাড়া কিছুটি শোনা যায় না।

মেইন রাস্তায় পৌঁছতে পৌঁছতে বৃষ্টির জোর একটু কমে আসে। এখন কেবল ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তার ধারের সোডিয়াম ল্যাম্পের হলদেটে আলো ভিজে পিচের ওপর পড়ে চিকচিক করছে। বৃষ্টির কারণে বেশিরভাগ দোকানপাটই বন্ধ হয়ে গেছে। হাতেগোনা কয়েকজন পথচারী আর দু-একটা চায়ের দোকানের ঝাঁপ খোলা আছে শুধু।

রাস্তার এক কোণায় ছাতা মাথায় আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিতাস। ছোটবেলার একটা বদভ্যাস আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। টেনশন হলে সে নখ কামড়াতে শুরু করে। এখন ঠিক সেটাই করছে সে। দাঁত দিয়ে ডান হাতের নখগুলো খুঁটছে। যতক্ষণ না আঙুলের ডগায় হালকা ব্যথা লাগে, এই বদভ্যাস তার কিছুতে যায় না।


খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে রুদ্র। একটা খালি অটোর খোঁজ করছে সে। আড়চোখে সে তিতাসের দিকে একবার তাকায়। মেয়েটার নখ কামড়ানো দেখে তার কপালে আবার ভাঁজ পড়ে। 'বড্ড নার্ভাস মেয়েটা,' রুদ্র মনে মনে ভাবে।

সে চাইলে নিজে মেয়েটাকে শ্যামবাজার পর্যন্ত ড্রপ করে আসতে পারত। কিন্তু যা পরিস্থিতি, তাতে সে যদি এখন একই অটোতে ওঠার প্রস্তাব দেয়, মেয়েটা নির্ঘাত ভয়ে অজ্ঞান হয়ে রাস্তাতে লুটিয়ে পড়বে! তার চেয়ে বরং অন্য ব্যবস্থা করা ভালো।

কিছুক্ষণ পরে একটা অটো ফাঁকা পেয়ে হাত দেখিয়ে দাঁড় করায় রুদ্র। অটোটা ঘ্যাঁচ করে তাদের সামনে এসে ব্রেক কষে। 

"যাবে? শ্যামবাজার?" রুদ্রর গলাটা এমনিতেই ভারী, তার ওপর এখন বেশ কড়া।

অটোয়ালা মাথা নাড়ে, "যাব। উঠুন।"

রুদ্র পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে। "আমি উঠব না, এই মেয়েটা যাবে।"

অটোয়ালা তিতাসের দিকে তাকাতে রুদ্র এক পা এগিয়ে যায়। "শোনো ভাই, ভালোয় ভালোয় মেয়েটাকে ওর বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে আসবে। ফোন নম্বরটা বলো তোমার।"

অটোয়ালা একটু ঘাবড়ে যায় রূদ্রর হাট্টাকাট্টা চেহারা দেখে। "কেন দাদা? নম্বর কেন?"

"যেটা বলছি সেটা করো," ফোনটা তুলে সে অটোর পেছনে তাক করে একটা ছবি তুলে নেয়। "তোমার অটোর নম্বর প্লেটের ছবি আমি তুলে নিয়েছি। আর তোমার নম্বরটাও আমার কাছে থাকছে। রাস্তায় যদি ওর একটা চুলও বাঁকা হয়, বা পৌঁছতে যদি এক মিনিটও দেরি হয়, তবে কাল সকালের সূর্যটা তোমার দেখা হবে না। সোজা গঙ্গার তলায় পাঠিয়ে দেব। কথাটা যেন মাথায় থাকে!"

তিতাস ছাতার তলা থেকে বড়ো বড়ো চোখ করে পুরো ঘটনাটা দেখছে। লোকটার কাণ্ডকারখানা দেখে সে রীতিমতো হতবাক। 'সব সময় শুধু গুন্ডামি! মানুষটা কি একটু স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে জানে না?'