Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

তেরো নম্বর ঘর - পর্ব 7

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁরা পৌঁছলেন বাড়ির পিছনের বাগানে। একটি শুকনো কুয়োর ভিতরে নামার সিঁড়ি ছিল। সিঁড়ির শেষ প্রান্তে একটি লোহার দরজা।

দরজার গায়ে লেখা—

'যারা এখানে প্রবেশ করবে, তারা নিজেদের অতীতকে সঙ্গে নিয়ে ফিরবে।'

দরজা খুলতেই ভেসে এলো  পচা জলের গন্ধ। ভিতরে অন্ধকার সুড়ঙ্গ। ইন্সপেক্টর অনিকেত টর্চ জ্বালিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো।

কিছু দূর যাওয়ার পর দেখা গেলো, দেওয়ালের গায়ে অসংখ্য হাতের ছাপ।

ছোটো হাত।

বড় হাত।

কিছু ছাপ যেন নখ দিয়ে পাথরের উপর আঁচড় কেটে তৈরি করা।

আর সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে একটা ছোট্ট ঘর আর সেই ঘরের মেঝেতে বসে আছে একজন বৃদ্ধা।

সাদা চুল।

শুকনো মুখ।

পরনে ময়লা শাড়ি।

তাঁর সামনে রাখা একটা পিতলের থালা।

থালায় শুকনো ফুল আর কালচে জল।

বৃদ্ধা টর্চের আলোয় মুখ তুললেন।

অনুব্রত বুকের ভিতরটা থেমে গেলো।

অনুব্রত সামনে যে বৃদ্ধা বসে আছে সে আর কেউ নয় সে অনুব্রতর মা মৃণালিনী দেবী… !!!!! 

অনুব্রত মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে এলো , “মা” ???

বৃদ্ধা টি অনুব্রত দিকে তাকিয়ে রইলো  তারপর ধীরে ধীরে বললো , "তুমি কে?"

অনুব্রত হাঁটু গেড়ে বসে বললো  , "আমি অনুব্রত। তোমার ছেলে।"

বৃদ্ধা অনেকক্ষণ অনুব্রতর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন তারপর কাঁপা হাতে অনুব্রতর গাল ছুঁয়ে বললেন, "আমার ছেলে তো ছোটো ছিল। তার বয়স দশ বছর।"

অনুব্রত কেঁদে ফেলল।

কান্না মাখা কণ্ঠে অনুব্রত বললো  , "অনেক বছর কেটে গেছে, মা… ।"

মৃণালিনী দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর তাঁর চোখে হঠাৎ আতঙ্ক ফুটে উঠল।

মৃণালিনী দেবী  ভয় আর আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে উঠলো , "তুমি এখানে এসেছ কেন? তোমাকে পালাতে হবে!"

অনুব্রত বললো  , "কেন?"

মৃণালিনী দেবী  বললো  , "ওরা তোমাকে খুঁজছে!"

অনুব্রত বললো  , "কারা আমাকে খুঁজছে মা ?"

মৃণালিনী দেবী  দুহাতে কান চেপে ধরে বললো  , "ওরা মরে না! ওরা কাউকে মরতে দেয় না!"

ইন্সপেক্টর অনিকেত একটু এগিয়ে এসে বললো  , "মৃণালিনী দেবী, আমরা আপনাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে এসেছি ।"

মৃণালিনী দেবী ইন্সপেক্টর অনিকেত এর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন।

আতঙ্ক মাখা গলায় মৃণালিনী দেবী বললো  ,  "না! না! ওদের বলবেন না! ওরা জানলে আবার আমাকে নিয়ে যাবে!"

অনুব্রত ওর মা কে জড়িয়ে ধরে বললো  , "কেউ তোমাকে আর কোথাও নিয়ে যাবে না।"

মৃণালিনী দেবী কাঁদতে লাগলো । সেই কান্নার মধ্যে তিনি এমন কিছু কথা বললেন, যা শুনে ইন্সপেক্টর অনিকেতর মুখের রং বদলে গেলো।

চল্লিশ বছর আগে, তেরো নম্বর ঘরে বন্দি হওয়ার পর আমি জানতে পেরেছিলাম , কুসুমের মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না। কুসুমকে হত্যা করা হয়েছিলো । তারপর তার দেহ গোপন সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো ।

কিন্তু সেই রাতে আরও একটি ঘটনা ঘটেছিল। আমি  যখন কুসুমকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম , তখন সুশান্ত আমাকে আক্রমণ করে।

সুশান্ত আমার মাথায় আঘাত করে। আমি জ্ঞান হারাই। সুশান্ত ভেবেছিল, আমি মারা গেছি । কিন্তু আমি বেঁচে ছিলাম। নিবারণ আমাকে গোপন সুড়ঙ্গে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রেখেছিল।

তারপর থেকে আমি এখানেই আছি। বাইরের জগতের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। খাবার দিত নিবারণ। জল দিত নিবারণ। বছরের পর বছর ধরে আমি আলো ভুলে গিয়েছিলাম , মানুষের মুখ ভুলে গিয়েছিলাম, এমনকি নিজের ছেলের মুখও।

কিন্তু তাঁর স্মৃতির ভিতরে একটি জিনিস বেঁচে ছিল।

সেই রাতের কথা।

যে রাতে কুসুম মারা গিয়েছিলো আর যে রাতে কেউ একজন তেরো নম্বর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।

"কে দরজা বন্ধ করেছিলো , মা?" অনুব্রত জিজ্ঞেস করলো।

মৃণালিনী দেবী অনুব্রতর হাত চেপে ধরলো।

"আমি জানি না।"

"কিন্তু তুমি তো বললে..."

"না! আমি জানি না!"

মৃণালিনী দেবী হঠাৎ অনুব্রত কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো— "কারণ দরজা বন্ধ হওয়ার সময় ঘরে কেউ ছিল না।"

অনুব্রত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো।

অনুব্রত  বললো  , "মানে?"

মৃণালিনী দেবী চোখ বন্ধ করে বললো  ,  "আমরা তিনজন ছিলাম। আমি, কুসুম আর..."

তিনি বাকিটা বলতে পারলেন না। হঠাৎ সুড়ঙ্গের ভিতরে প্রচণ্ড শব্দ হলো। যেন বিশাল কোনো লোহার দরজা বন্ধ হয়ে গেলো।

তারপর অন্ধকারের ভিতর থেকে একটা গলা ভেসে এলো ।

"মা..."

একটি শিশুর গলা। শিশুটি বলছে ,” মা …… তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?"

মৃণালিনী চিৎকার করে বলে উঠলো  , "না! ওকে আমার কাছে আসতে দিও না!"

অনুব্রত টর্চের আলো ঘোরাল। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে দশ বছরের একটি ছেলে।

সাদা জামা।

কালো প্যান্ট।

পায়ে জুতো নেই।

মুখটা অনুব্রতর ছোটোবেলার মুখের মতো। একেবারে একই।

ছেলেটি হাসল তারপর বললো  , "মা, তুমি তো বলেছিলে, আমরা একসঙ্গে থাকব।"

অনুব্রত বুঝতে পারল না, সে কী দেখছে।

তারপর ছেলেটি অনুব্রতর দিকে তাকিয়ে বললো   , "তুমি কে?"

প্রশ্নটা শুনে অনুব্রতর বুকের ভিতরে যেন কিছু একটা ভেঙে গেলো। কারণ ছেলেটির মুখের বাঁদিকে একটা ছোট্ট দাগ ছিল। সেই দাগটা অনুব্রতর নিজের মুখেও ছিল। কিন্তু ছেলেটির দাগটা ছিল উল্টো দিকে। যেন আয়নার প্রতিবিম্ব।