মার্কস বাই সিন–৯
আমাদের গল্পের হিরো আহানের জীবনে তিনটে ভালোবাসা—একটা তার কাজ, ফ্যামিলি এবং তার শখের রয়্যাল এনফিল্ড। বাকিদের মতো হীরে-সোনা বা প্রেমে তার টান নেই। এই তিনটি জিনিসই ওর স্পিড, ওর থ্রিল, এবং ওর একমাত্র শান্তির জায়গা শান্তি।
পুলিশ স্টেশনের বাইরে বাইকে টুং টুং করে চাবি ঘোরাতেই ইঞ্জিন গর্জে ওঠে। সোজা গিয়ারে তুলে গতি বাড়ায় আহান। হেলমেটের ভিতরে ঠোঁটের কোণে এক ফালি তির্যক হাসি খেলে যায় ওর। ধীরে ধীরে বাইকের গতি বাড়ে, আর সঙ্গে সঙ্গেই ঠোঁটে উঠে আসে এক পুরোনো গান— হালকা গলায় গুনগুন করতে করতে ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত ভিড়ে মিশে যায় সে।
যতক্ষণ আহান গাড়ি চালাক, ততক্ষণে আহান সেনগুপ্তর একটা ছোটো পরিচয় দিয়ে দেওয়া যাক। আহান সেনগুপ্ত — একটি নাম, একটি অভিমত, এক অদম্য আস্থা।
আহানের বয়স তিরিশ ছুঁইছুঁই। ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের অফিসার। কর্মঠ, সৎ, এবং নিয়মের কাছে নির্ভীক এক যোদ্ধা। তার জীবনের মূলমন্ত্র—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। অন্যায় করলেই শাস্তি পেতে হবে, সে যেই হোক না কেন।
আহান বিশ্বাস করে, শর্টকাট নয়, জীবন চলবে নিজের পরিশ্রমের জোরে। তার তামাটে গায়ের রঙ, ছাঁটা সুন্দর চুল, টানটান শরীর, চোখে ঘন কালো শেডস, আর মুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা—যেটা যে কাউকে মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিতে পারে।
আহানকে শুধু হ্যান্ডসাম বলা যায় না, ওর মধ্যে একটা আলাদা ধরণের আকর্ষণ আছে, যা চাইলেও কেউ উপেক্ষা করতে পারবে না। আহান হাসলে ওর দুই গালে টোল পড়ে, যার ফলে ওকে দেখতে আরোও অসাধারণ লাগে। অথচ আজ পর্যন্ত কাজের সময় কেউ ওকে হাসতে দেখেনি। আহান সেনগুপ্ত— যার জন্য শুধু নারীরা নয়, বহু পুরুষও ওর একটা চাহনির জন্য রাত জাগে।
স্পষ্টবাদী মনোভাব আর পলিটিশানদের প্রতি আপসহীন অবস্থানের জন্য সাত বছরের ক্যারিয়ারে অন্তত পাঁচবার সাসপেন্ড হয়েছে আহানের। এমনকি এবারেও সাত মাসের সাসপেনশন ছিল তার।
কার্ল নামের মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনালকে ধরতে এবার দরকার এমন একজন, যে কারোর ছায়া না মেনে কাজ করবে। আর সেই কারনেই পাঁচ মাসের মধ্যে ওর সাসপেনশন তুলে নেওয়া হয়েছে। কারণ একমাত্র আহান ছাড়া আর কারোর পক্ষেই ভয়ডরহীন ভাবে কার্লের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
আহান কাজে ফিরেই মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে ড্রাগস চক্রের একটা বড়ো শাখা ধ্বংস করেছে। ওর জীবনে তিনটে শব্দে সে মেনে চলে—নিয়ম, ন্যায়, শৃঙ্খলা।
রাগের মাথায় সে হিমশীতল কণ্ঠে এমন হুমকি ছুঁড়ে দিতে পারে, যেটা গায়ে কাঁটা দেয়। কিন্তু কাছের কেউ বিপদে পড়লে—প্রাণ দিতেও পিছপা হয় না।
এমন আহান সেনগুপ্ত জীবনের তিরিশটা বসন্ত একা কাটিয়ে দিয়েও তার কোনো আফসোস নেই। আজও সে নিজের মতো করে একা থাকতে চায়। পরিবার বারবার চেষ্টা করেছে তার বিয়ে দিতে, কিন্তু আহান জানে, তার দুনিয়া এখনো কাউকে জায়গা দেবার মতো নিরাপদ নয়। তাই সে নিজের হৃদয়ের দরজা বন্ধ রেখেছে—অন্তত আপাতত।
তবে এর পেছনে একটা গভীর কারণ আছে। আহান সমকামী। আজ্ঞে হ্যাঁ আহান মেয়েদের নয় ছেলেটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। এই সত্যিটা যখন প্রথম বুঝেছিল, তখন মনে হয়েছিল পুরো দুনিয়া থেমে গেছে ওর জন্য। ছোটোবেলায় যেটা ‘ভুল’, ‘পাপ’ বলে শেখানো হয়েছিল, সেটাই নিজের মধ্যে দেখে আহান নিজেকেই ঘৃণা করতে শুরু করেছিল প্রথমে। ভেবেছিল এটা হয়তো ভগবানের শাস্তি, ওর করা কোনো অপরাধের ফল।
যখন আহান নিজেকে সহ্য করতে পারতো না, নিজের আসল পরিচয় জানার পর নিজেকে চরম ঘৃণা করতো তখন ওর দাদা ছিল একমাত্র ভরসা। সেই ছিল প্রথম, আর একমাত্র মানুষ, যে ওর পাশে দাঁড়িয়েছিল। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে আহান। বাইরে থেকে যতোই শক্ত দেখাক, ভিতরে এখনো একটা ভয় লুকিয়ে থাকে ওর—যদি কেউ জেনে যায়? যদি কেউ মজা করে? সেই ভয়েই আজও কারো সামনে নিজের মনের কথা বলেনি সে।
এই তিরিশ বছরে অনেককে দেখেছে, এইরকম নয় যে কাউকে ভালো লাগেনি ওর, কিন্তু কাউকে কখনো নিজের ছায়ার কাছেও আসতে দেয়নি। কারণ আহান জানে, পুলিশের ব্যাজটা যতটা ওকে শক্ত করে, ততটাই ওকে একা করে দেয়। আর এই একাকীত্বের ভারটুকু ও গোপন করে রেখেছে বুকের ভেতর, যতটা পারে।
আহান কোনোদিন তার মাকে দেখেনি। জন্মের দু’দিন পরেই ওর মা মারা যান। বাবাও ছিলেন পুলিশ—ডিউটির মাঝে সময় দেওয়ার সুযোগ কম ছিল, কিন্তু ভালোবাসার কোনো ঘাটতি ছিল না। ছোটো আহানের পৃথিবী ছিল তার দাদা আশীষকে ঘিরে।
আহান নিজের মনের সব কথা, আনন্দ, কান্না, স্বপ্ন— সবকিছু ভাগ করে নিত নিজের দাদার সঙ্গে। ভাবলেও হাসি পায় এখন—ছেলেবেলার দুষ্টুমি, রাত জেগে গল্প পড়া, দু’জনে মিলে টিভির রিমোট নিয়ে যুদ্ধ— সব মনে পড়ে ওর। আর এখন এইসব নিয়ে ভাবলেও হাসি পায় আহানের।
চলবে................................