Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

প্রাইভেট আই সোসাইটি - 6


এটা কী রকম ব্যাপার?

টিভি স্ক্রিনের দিকে প্রায় এক মিনিট হাঁ করে তাকিয়ে থাকার পর সুবীর প্রথম যে মন্তব্যটা করল, তা হলো— “হুঁ।”

তারপর চশমাটা নাক থেকে খুলে গেঞ্জির খুঁট দিয়ে মুছতে মুছতে আরও কিছুক্ষণ বাদে বলল, “আচ্ছা, এক সপ্তাহে মহারাষ্ট্রের লোনার লেক থেকে ট্রেন বা ফ্লাইটে করে কলকাতা বন্দরে আসাটা তো এমন কিছু অস্বাভাবিক নয় শিবু। দূরত্বটা বেশি হলেও যাতায়াত ব্যবস্থা তো সচল।”

আমি প্রায় খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ফুঁসে উঠলাম, “আরে দূর মদন! লোনার লেক থেকে কলকাতা আসাটা অস্বাভাবিক নয় বুঝলাম, কিন্তু তাই বলে যেখানেই একটা রহস্যজনক ঘটনা ঘটবে, সেখানেই কি এই একই লোক কালো চশমা পরে ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকবে? এটা কেমন কথা? ”

“হ্যাঁ, সেটা ঠিক। কিন্তু বাবা... কিছুই তো মাথায় আসছে না!” সুবীর এবার নিজের মাথাটা জোরে জোরে চুলকাল। ওর মতো ঠান্ডা মাথার ‘তারকাটা’ মানুষের কপালে এই প্রথম আমি কয়েক বিন্দু ঘাম দেখতে পেলাম। পরিস্থিতি যে সত্যিই জটিল, সেটা ওর কপাল দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।

আমি তখন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া একঝাঁক প্রশ্নের চোটে হাবুডুবু খাচ্ছি। হঠাৎ একটা ধরে সজোরে টান দিলাম, “অ্যাই সুবীর, এই যে ছেলেটা—লি মিং না ছাতা কী যেন নাম—এর ছবিটা তোর ঘরে পিন দিয়ে আটকানো ছিল না? খবরের কাগজের কাটিং, আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম কয়েকদিন আগে!”

সুবীর চমকে উঠে বলল, “হ্যাঁ, ছিল তো! ও তো বেশ কিছুদিন ধরে নিখোঁজ ছিল। চায়নাটাউনের লোহার ব্যবসার কোনো একটা ঝামেলায় ও গায়েব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি তো ভেবেছিলাম ও এমনি এমনিই কোথাও চলে গেছে... না না না, দাঁড়া দাঁড়া। ব্যাপারটা কীরকম যেন ঘেঁটে যাচ্ছে সবকিছু মাইরি!”

সুবীর পেছনের প্লাস্টিকের নীল চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ল। ওর চোখের মণি দুটো তখন এদিক-ওদিক ঘুরছে। ডায়েরির পাতাগুলো ও মাথার ভেতরেই ওলটপালট করছে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

সুবীরের মতো লোককে এরকম দমে যেতে দেখে এবার আমার সত্যি সত্যি ভয় করতে শুরু করল। কলকাতা শহরের বুকে জ্যান্ত মানুষের দাঁত উপড়ে ফেলা ডাক্তার আমি, কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগছিল। শুকনো থুতু গিলে ফিসফিস করে বললাম, “ইয়ে... ব্যাপারটা কি পুলিশ বা সরকারকে জানাবি?”

ওয়াক থু!” সুবীর এমন একটা শব্দ করল যেন খৈনি খেয়ে ঘরের কোণে পিক ফেলল। ও মুখটা বিকৃত করে বলল, “পাগল হয়েছিস শিবু? আইনের ওই লোকগুলো আবার মানুষ নাকি? আমরা এই থিওরি নিয়ে থানায় গেলে ওরাই আমাদের উল্টে লক-আপে পুরে দেবে। তারপর দেখবি মেহগনি কাঠের লাঠি দিয়ে আমাদেরই পেটাচ্ছে এটা বার করার জন্য যে—আমরা কেন আর কীভাবে লি মিংকে খুন করেছি! তার চেয়ে বড় কথা, ওরা আমার এই ঘর সিল করে সব কাটিং বাজেয়াপ্ত করে নেবে। সেটা আমি জান থাকতে হতে দেব না।”

অকাট্য যুক্তি। এর ওপর আর তর্ক করে লাভ নেই। সাধারণ মানুষ কোনো ঝামেলায় পড়লে পুলিশের কাছে পরে যায়, আগে নিজেকে বাঁচানোর রাস্তা খোঁজে। আমরাও ব্যতিক্রম নই।

আমি নিজের পেটে হাত বুলিয়ে মাথা চুলকোলাম, “সবই তো বুঝলাম ভাই, কিন্তু আমার পেটের মধ্যে কেমন একটা গ্যাস হচ্ছে। ভেতরে কোনো বড় খবর বা রহস্য চাপা থাকলেই আমার এরকম এসিডিটি হয়ে যায়, বুঝলি তো? অন্তত কাউকে যদি এটা না বলতে পারি, কাল সকালে চেম্বারে গিয়ে কিন্তু পেশেন্টের দাঁতের বদলে জিভ তুলে চলে আসব আমি।”

আমার কথা শুনে সুবীর হঠাৎ চুপ করে গেল। ও আমার দিকে তাকাল, আর আমি তাকালাম ওর দিকে। আমাদের দুজনের মাথায় একই সঙ্গে বোধহয় আইডিয়াটা থাবা বসাল। কোনো কথা না বলেই আমরা দুজন এক সাথে ঘুরে ঘরের কোণে রাখা ধ্যাড়ধ্যাড়ে সিআরটি মনিটরের কম্পিউটারটার দিকে তাকালাম।

উইন্ডোজ এক্সপির সেই চেনা নীল স্ক্রিনটা তখনো জ্বলজ্বল করছে। ইন্টারনেটের সেই রহস্যময় ফোরামের অ্যাকাউন্টটার সদব্যবহার করার সময় মনে হচ্ছে এবার এসে গেছে। আর কোনো লুকোছাপা নয়, আর কোনো দোটানা নয়।

সুবীর কি-বোর্ডটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে দ্রুত আঙুল চালাতে শুরু করল। মনিটরের আলোয় ওর গম্ভীর মুখটা আরও রহস্যময় দেখাচ্ছিল। ও মাউসটা ক্লিক করে অ্যাকাউন্ট খোলার ফর্মটা সামনে আনল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “নামটা তা হলে ওটাই থাক? পরে আর বদলানো যাবে না কিন্তু।”

আমি একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সোফায় বসলাম। আর কোনো আপত্তি করলাম না। বললাম, “হ্যাঁ, দে।”

সুবীর কি-বোর্ডে টাইপ করল— ‘Private Eye Society’।