Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

প্রাইভেট আই সোসাইটি - 8


হ্যাঁ, ব্যাপারটা সত্যিই। একদম একশো ভাগ সত্যি।

তবে আমাদের দেওয়া তিনটে থিওরির মধ্যে ঠিক কোনটা হুবহু মিলে গেছে, সেটা এক কথায় বলা যাবে না। বলা ভালো, সব কটারই একটু-আধটু অদ্ভুত খিচুড়ি তৈরি হয়েছে। ডকের ধারে মৃত ছেলেটা আসলে লি মিং নয়, ও বেঁচে আছে। যে মারা গেছে, সে হলো লি মিং-এর যমজ ভাই! দুজনে দেখতে এতটাই একরকম যে প্রথম নজরে পুলিশও ধোঁকা খেয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ওর ফ্যামিলি এসে পেটের কাছের একটা বিশেষ জন্মদাগ দেখে ডেডবডি শনাক্ত করেছে।

শুধু তাই নয়, সিসিটিভি ফুটেজে নাকি দেখা গেছে—মরার আগে ওই ছেলেটি ডকের কয়েকটা কাঠের ক্রেটের আড়ালে লুকিয়ে ওত পেতে কারুর গোপন কথাবার্তা শুনছিল। তারপর সেই অচেনা লোকগুলো ওকে দেখে ফেলে এবং সরাসরি বুক লক্ষ্য করে গুলি চালায়। কিন্তু ফরেন্সিক রিপোর্টে জানা গেছে, ছেলেটার শরীরে কোনো গুলির চিহ্ন বা বুলেট মেলেনি! যেন গুলি দুটো মাঝরাস্তায় মামাবাড়ি বেড়াতে চলে গেছে! অর্থাৎ—‘কোনো অচেনা উপায়ে মৃত্যু’। আমাদের সেকেন্ড থিওরিও মিলে গেছে অক্ষরে অক্ষরে।

কিন্তু এটা কী ধরনের রসিকতা? সুবীর ঘরে বসে আরামকেদারায় পিঠ ঠেকিয়ে মনের সুখে কয়েকটা উটকো থিওরি বানিয়ে দিল, আর সেগুলো ডকের ডাইরেক্ট অ্যাকশনের সাথে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল?

আমার তো এবার খটকা লাগছে। সুবীর নিজেই এই পুরো গেমের মাস্টারমাইন্ড নয় তো? ও নিজেই ভিলেনদের সাথে যুক্ত নয় তো?

আমি সন্দেহী চোখে তাকাতেই সুবীর আমার দিকে এমনভাবে চশমার ওপর দিয়ে তাকাল, যেন আমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গবেট আর বলদ। ও চশমাটা নাকের ওপর আর একটু চেপে দিয়ে বলল, “আমি যদি মাস্টারমাইন্ড হতাম শিবু, এই সস্তার চা গিলতাম না, আর তোকেও রোজ সহ্য করতাম না।”

অকাট্য যুক্তি, কিন্তু মনে শান্তি নেই। ইতিমধ্যে ল্যাপটপের স্ক্রিনে কমেন্টের সংখ্যা হু-হু করে বেড়েই চলেছে। ডিজিটাল দুনিয়ায় কোনো খবর চাউর হতে আজকাল বেশি সময় লাগে না। একবার যদি কলকাতার কোনো সাংবাদিকের হাতে আমাদের এই ‘Private Eye Society’ অ্যাকাউন্টের খবর চলে যায়, তবে আমাকে আর সুবীরকে রীতিমতো প্রস্থেটিক মেকআপ বা নকল দাড়ি-গোঁফ পরে রাস্তায় ঘুরতে হবে। মিডিয়া ট্রায়ালে আমাদের লাইফ হেল হয়ে যাবে।

আমি ভয় পেয়ে বললাম, “ভাই সুবীর, ঢের হয়েছে গোয়েন্দাগিরি। অ্যাকাউন্টটা ডিলিট করে দে। চল, কম্পিউটার টা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলি।”

সুবীর অমনি হাত-পা নেড়ে ছিটকে উঠল, “পাগল নাকি! দাঁড়াও না, দেখি জল কতদূর গড়ায়! লাইফে এই প্রথম একটা থ্রিল এসেছে।”

হে ভগবান! এ আমি কার পাল্লায় পড়লাম? এ তো সুইসাইডয়াল! নিজে শুধু ডুববে তা না, আমাকেও ডোবাবে!

যাই হোক, আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালাম না। সুবীরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে, চোরের মতো চারপাশ দেখতে দেখতে নিজের ক্লিনিকে গেলাম। ভাগ্যবশত সেদিন রুগী কম ছিল, মাত্র দুজন। কোনোমতে কাঁপাকাঁপা হাতে নার্ভ শক্ত করে একটা মোলার দাঁত উপড়ে ফেললাম। হাত-পা ঘামছিল। চেম্বার তাড়াতাড়ি বন্ধ করে সুকান্ত মল্লিক রোডের ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম। সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে তিনটে ইয়া বড় বড় লক লাগিয়ে দিলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম—আগামী দুদিন, না, অন্তত এক সপ্তাহের মধ্যে ভুলেও সুবীরের বাড়ির পথ মাড়াব না। আগে লোকমুখে এই ইন্টারনেটের খবরটা চাপা পড়ুক, তারপর দেখা যাবে।

কিন্তু আমি তো আগেই বলেছিলাম— ‘তুমি যাও বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে!’ কপাল জিনিসটা ফেভিকলের আঠার মতো পিঠে সেঁটে থাকে।

ফ্ল্যাটের খাটে বসে একটু হাঁফ ছাড়ছি, এমন সময় ঠিক আমার হার্টবিট স্তব্ধ করে দিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসছে। বুকটা ধড়াস করে উঠল। এই বুঝি সেই যমদূত!

নম্বরটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। ওহ না, যাক বাবা! বেঁচে গেলাম।

তুতুন মাসির ফোন। মাসি সাধারণত এই সময়ে ফোন করে না। আমি কোনো রকমে গলাটা স্বাভাবিক করে ফোনটা কানে ধরলাম, “হ্যাঁ মাসি বলো! সব ভালো তো?”

ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না। নিথর নীরবতা।

আমি একটু অবাক হয়ে আবার বললাম, “মাসি? শুনতে পাচ্ছো?”

তবুও কোনো সাড়াশব্দ নেই। কেউ কি ওপাশের লাইনে নেই নাকি? নাকি নেটওয়ার্কের প্রবলেম? কিন্তু ফোনের স্পিকার থেকে একটা অদ্ভুত ‘কর কর’ করে যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে আসছে, যেন কোনো অ্যানালগ রেডিওর টিউনিং করা হচ্ছে।

আমি বিরক্ত হয়ে চেঁচালাম, “হ্যালো! হ্যালো!! কে বলছেন?”

হঠাৎ তুতুন মাসির সেই চেনা খ্যানখ্যানে গলাটা উধাও হয়ে গেল। তার বদলে স্পিকারে ভেসে এল এক ভারী, বরফের মতো ঠান্ডা এবং যান্ত্রিক ইংরেজি কন্ঠস্বর:

“Shut your fking mouth and listen to me very carefully. Understand?”

...হে ভগবান!

আমার জিভ শুকিয়ে তালুর সাথে সেঁটে গেল। হাত-পা অবশ। কী আর বলব এর উত্তরে? ততক্ষণে নিজেকে পুরোপুরি ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়েছি। গলা থেকে একটা অত্যন্ত প্যাথেটিক, মরণাপন্ন মুরগির মতো আওয়াজ বেরোল, “উঁ...”

ওপাশ থেকে সেই ঠান্ডা গলা আবার বলতে শুরু করল:

“We know that you know too much too early about some things. I hope you are getting what the hell I am talking about. So either you are somehow a telepathic genius, or more plausibly... you know about our operations and have been tracking us for quite some time.”

ফোনের ওপার থেকে একটা হালকা দেশলাই কাঠি জ্বলার শব্দ হলো। লোকটা যেন একটা সিগারেট ধরাল। তারপর বলল:

“So here is the deal. We are not cruel, nor are we in a hurry. Because we know that not a single person escapes us. You have exactly 10 days to live with your family. Do the things you want, eat what you like, yada yada... Then, our hitman will be at both of your houses, or wherever you will be. We will execute you right then and there. That’s a promise... 

Good night, Mr. Shibnath Banerjee.”

খটাস করে লাইনটা কেটে গেল।

ফোনটা আমার অবশ হাত থেকে ফস্কে বিছানায় পড়ে গেল। আর তার সাথে সাথে আমার পঁচিশ বছরের জ্যান্ত শরীরটাও বিছানায় ধপ করে ভেঙে পড়ল। মাথার ভেতরটা পুরো ফাঁকা। চোখে সর্ষে ফুল দেখছি।

তার মানে সেই কালো চশমাওয়ালা লোকটা... সেই অর্গানাইজেশনটা সত্যি! আর ওরা ভেবেছে আমরা ওদের ওপর নজর রাখছি! ১০ দিন! আমাদের হাতে আর মাত্র দশটা দিন সময় আছে বেঁচে থাকার!

আমি অন্ধকার ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় আর্তনাদ করে উঠলাম:

“সুবীর রে...!!!”

-- ১০ দিন বাকি --