আমি আর সুবীর থিওরি বানানোর কাজে লেগে গেলাম। এটা পোস্ট করবোই।
কিন্তু শুধু যদি লিখে দিই— ‘এই লোকটাকে বারবার দু’টো রহস্যময় জায়গায় দেখা গেছে’, তবে তাতে কোনো মজা থাকে না। পাবলিক সেটাকে স্রেফ কোইনসিডেন্স বা কাকতালীয় ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের কাছে অকাট্য কোনো প্রমাণও নেই। তাছাড়া, মস্তিস্ক খাটানোর মতো এর থেকে ভালো রসদ আর কী-ই বা পেতে পারতাম আমরা? যদি আমাদের বানানো কোনো থিওরি একবার সত্যি হয়ে যায়!
পরবর্তীকালে এই থিওরিগুলো আমাদের জীবনে কী যে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ডেকে আনবে, সেটা যদি সেদিন বিন্দুমাত্র টের পেতাম, তবে আমি ওই ধ্যাড়ধ্যাড়ে কম্পিউটারটা লাথি মেরে বন্ধ করে সোজা গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে আসতাম, জীবনেও আর গোয়েন্দাগিরির নাম মুখেও আনতাম না।
যাই হোক, ভবিষ্যতের সেই আশঙ্কার কথা কোনোভাবেই টের না পেয়ে আমি আর সুবীর তখন খাতা-পেন্সিল নিয়ে বসলাম। আমার কাছে একটা একদম নতুন সাদা খাতা, হাতে একটা ওয়াটারম্যান ফাউন্টেন পেন (কারণ যতই আমি সাধারণ ঘরের ছেলে হই না কেন, নিজেকে একটু ইম্পরট্যান্ট ভাবাটা আমি কোনোদিনই বন্ধ করতে পারি না) আর পাশে একটা জলের বোতল। সুবীর আমার ঠিক উল্টো দিকের চেয়ারে বসল একতাড়া পুরনো কাগজ আর একটা ডট পেন নিয়ে।
“লেখ,” সুবীর গম্ভীর গলায় ডিক্টেশন দেওয়ার মতো করে বলল, “থিওরিস রিলেটেড টু দা মিস্টেরিয়াস ডেথ অফ লি মিং।”
আমি পেনটা উঁচিয়ে বললাম, “ইয়ে, এত ফরমাল কেন ভাই? আমরা কি বড়বাবুকে রিপোর্ট পাঠাচ্ছি?”
সুবীর বিরক্ত হয়ে কপালে ভাঁজ ফেলল, “যা বলছি লেখ না ঘোড়ার ডিম! বেশি পণ্ডিতি করিস না।”
আমি অগত্যা খাতায় ওটাই লিখলাম।
সুবীর বলতে শুরু করল, “থিওরি ১। আমার মনে হয় লি মিংকে ওর নিজের ফ্যামিলিই খুন করেছে। ছেলেটা সম্ভবত ব্যবসার কোনো টাকা-পয়সা বা গোপন নথি নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেই রাগ থেকে রিভেঞ্জ বা অনার কিলিং হতেই পারে, কী বলিস?”
আমি খসখস করে লিখতে লিখতে বললাম, “কিন্তু টিভিতে লি মিং যে এতদিন ধরে নিখোঁজ ছিল, সেই নিয়ে তো কিছু বলল না?”
“আরে আসছি সেটায়, ধৈর্যঙ্গ সময়তাও লক্ষ— ধুর ছাই, কী যেন একটা সংস্কৃত শ্লোক ছিল, ভুলে গেছি ওসব। তুই আগে লেখ।”
আমি লিখলাম। সুবীরের মুখ থেকে হঠাৎ সংস্কৃত শোনার চেষ্টায় আমার বুকটা কেমন ধকধক করে উঠল।
“থিওরি নাম্বার টু,” সুবীর পেন দিয়ে টেবিলটা টোকা মারল, “লি মিংকে খুন করেছে ওই কালো চশমাওয়ালা লোকটা। সে লোনার লেকে কেন ছিল, তার ব্যাখ্যা করতে গেলে... ইয়ে, ধর এমন হতেই তো পারে যে লোকটা কোনো আন্তর্জাতিক ভিলেন অর্গানাইজেশনের এজেন্ট। আর লি মিং ভুল করে ওদের কোনো গোপন কাজ বা জিনিস দেখে ফেলেছিল। তাই বেচারাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো।”
আমি মাথা নাড়লাম। হুম, দম আছে বলতে হবে এই থিওরিতে। হলিউডের ক্রাইম থ্রিলার সিনেমায় তো সাধারণত এরকমই হতে দেখেছি আমরা।
আমি এটাও খাতায় নোট করে নিলাম। এবার সুবীর একটু থামল, তারপর সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বলল, “নাম্বার থ্রি... লি মিং আসলে মরেনি। ও বেঁচে আছে এবং সম্পূর্ণ অক্ষত আছে। ডকের ধারে যাকে পাওয়া গেছে, ওটা আসলে অন্য কেউ। বডি ডাবল!”
“অ্যাঁ?” আমার মুখটা হাঁ হয়ে গেল, “বলিস কী রে? টিভিতে তো ওর নাম-পরিচয় সব দিয়ে দিল!”
আমার আতঙ্কিত আর ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখটা দেখে সুবীর নিজের মুখটা একটু পাংশুটে করে বলল, “আরে, আমি বলছি না যে ওটাই ১০০% হয়েছে। দুটো তো সিরিয়াস থিওরি দিলাম, এবার একটা অন্ধকারে ঢিল মারতে ক্ষতি কী? ট্রিপল সেফটি যাকে বলে।”
আবার অকাট্য যুক্তি। তর্কে যাওয়ার সাহস আমার হলো না। তাছাড়া আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে ইদানীং দেখেছি, এই ধরনের অদ্ভুত আর উল্টোপাল্টা কনস্পিরেসি থিওরিগুলোই সাধারণত অনলাইনে বেশি ‘এনগেজমেন্ট’ বাড়ায়। লোকে সাধারণ সত্যি কথার চেয়ে এইরকম অলৌকিক বা ম্যাড-সাইন্টিস্ট মার্কা থিওরি পড়েই বেশি আনন্দ পায়।
আমার লেখা শেষ হলো এখানে। সুবীর একটা দীর্ঘ হাই তুলল। ঘড়িতে তখন রাত দশটা বেজে গেছে। ও সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “শিবু, তুই একটা কাজ কর আজকে। বাড়ি না গিয়ে এখানেই থেকে যা। এত রাত্তিরে অতটা রাস্তা জার্নি করে ফ্ল্যাটে ফেরার কোনো মানে হয় না। আমি শুতে যাচ্ছি। তুই থিওরিটা অনলাইনে আপলোড করে দিয়ে পাশের গেস্ট রুমে গিয়ে লম্বা হয়ে পড়। কাল সকালে না হয় বেরোবি।”
আমি দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম। সুবীর ঠিকই বলেছে। এই ক্লান্ত শরীরে আবার সুকান্ত মল্লিক রোডের ফ্ল্যাটে যাওয়ার ধকল নিতে ইচ্ছে করছিল না। আমি একটা থাম্বস-আপ দিয়ে কম্পিউটারের সামনে গিয়ে ধপ করে বসলাম।
ফোরামের স্ক্রিনটা খোলাই ছিল, আমাদের নতুন অ্যাকাউন্ট— ‘Private Eye Society’ ও তৈরি। আমি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে টাইপ করতে শুরু করলাম। ওই সানগ্লাস পরা লোকটাকে কীভাবে দুটো আলাদা রাজ্যের মিস্ট্রি স্পটে একই পোশাকে দেখা গেল, লি মিং কীভাবে নিখোঁজ থেকে হঠাৎ লাশ হয়ে ডকে ফিরল, আর সুবীরের দেওয়া সেই তিনটে জবরদস্ত থিওরি—সব মিলিয়ে বেশ একটা চিত্তাকর্ষক এবং মশলাদার পোস্ট তৈরি করলাম।
পোস্টের ‘সাবমিট’ বোতামে চাপ দিয়ে আমি একটা জম্পেশ আড়মোড়া ভাঙলাম। হিন্দি সিনেমায় যে রকম দেখায়—ক্লিক করার সাথে সাথেই হাজার হাজার মানুষ যেন পোস্টের ওপর পঙ্গপালের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ে, আমাদের ক্ষেত্রে অবশ্য সেরকম কিচ্ছু হলো না। কয়েক মিনিট স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার পরও কোনো লাইক বা কমেন্ট পড়ল না।
আমি বিরক্ত হয়ে কম্পিউটার বন্ধ করে শুতে গেলাম। সুবীরের গেস্ট রুমটা বেশ ছোটখাটো আর আরামদায়ক। মে মে মাসের গরমের মধ্যেও কলকাতার রাতের একটা হালকা হাওয়া দিচ্ছিল। আমি গায়ের ওপর পাতলা চাদরটা টেনে দিয়ে চোখ বুজলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্তি আমাকে গ্রাস করল।
রাতের শেষভাগে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম, আমি কলকাতার সেই অন্ধকার ডকের ধারে একা দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ সেই কালো সানগ্লাস পরা লোকটা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে নাচতে নাচতে আমার সামনে এগিয়ে এল। এসে কোনো কথা না বলে সজোরে আমার কানটা টেনে ধরল। যন্ত্রণায় আমি চিৎকার করতে যাব, এমন সময় দেখলাম লোকটার মুখটা বদলে গিয়ে অবিকল সুবীরের মতো হয়ে গেল! আর সেই সুবীর-রূপী এজেন্ট গম্ভীর গলায় আমাকে বলল, “ওঠ বলছি ওঠ! অনেক বড় কাজ আছে, ওঠ ওঠ ওঠ!”
আমি ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। চোখ রগড়ে দেখলাম সকাল হয়ে গেছে। কিন্তু জানলার আলো ছাপিয়ে দেখলাম, সত্যি সত্যিই সুবীর আমার ডান কানটা ধরে টানছে! আমি জেগে উঠতেই ও কানটা ছেড়ে দিয়ে একটা ব্যাজার মুখ করে বলল, “একেবারে স্লিপিং বিউটি! ঘুম ভাঙাতে কি কোনো রাজকুমার নিয়ে আসতে হবে, নাকি একটা ব্যাঙ দিলেই চলবে?”
আমি কানের পাশটা ডলতে ডলতে চেঁচালাম, “তাই বলে তুই ঘুম থেকে তোলার জন্য আমার কান ধরে টানবি?”
“বেশ করেছি টেনেছি! এখন ওইসব ন্যাকামি বন্ধ কর আর জলদি গিয়ে কম্পিউটারের সামনে বোস। তোর রাতের ঘুম এবার চিরকালের মতো উড়ে যাবে।” সুবীরের গলার স্বর কেমন যেন কাঁপছিল।
আমি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, চটিটা কোনোমতে পায়ে গলিয়ে ড্রয়িংরুমের কম্পিউটারের দিকে ছুটে গেলাম।
সুবীর মোটেও একটাও মিথ্যা কথা বলেনি। মনিটরের দিকে তাকিয়ে আমার চোখের পাতা স্থির হয়ে গেল। সত্যি সত্যিই আমার ঘুম উবে যাওয়ার জোগাড়। আমাদের সেই গতকাল রাতের করা সাদামাটা পোস্টটার নিচে এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৭০টা কমেন্ট চলে এসেছে! আর তার চেয়েও বড় ধাক্কা হলো—ম্যাক্সিমাম লোক কমেন্ট বক্সে লিখছে, “হাউ ইজ দিস পসিবল? আপনারা কীভাবে এই নিখুঁত জিনিসটা আগেই প্রেডিক্ট করে ফেললেন? হু আর ইউ গাইজ?”
আমি আর সুবীর একে অপরের দিকে তাকালাম। আমাদের পিঠ বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। হায় রে কপাল! আমরা অন্ধকারে যে ঢিলটা মেরেছিলাম, সেটা কি শেষ পর্যন্ত একদম ঠিক জায়গায় গিয়ে লেগে গেল? আমরাই ঠিক হয়ে গেলাম এবার ?