Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

তিতাস নদী - পর্ব 10

হাসপাতালের অটোমেটিক স্লাইডিং ডোর দিয়ে ভেতরে ঢুকতে এসির ঠান্ডা বাতাসের সাথে ফিনাইল, স্পিরিট আর ওষুধের একটা চেনা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারে। রিসেপশন এরিয়াটা রীতিমতো সরগরম। একধারে উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীর পরিজন, অন্যদিকে নার্স আর ওয়ার্ডবয়দের ব্যস্ত পদচারণা। মাথার ওপর স্পিকারে অনবরত অ্যানাউন্সমেন্ট চলছে, "ডক্টর সেন, প্লিজ রিপোর্ট টু দ্য ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড ইমিডিয়েটলি।" একপাশ দিয়ে একটা হুইলচেয়ার দ্রুত গতিতে লিফটের দিকে এগিয়ে যায়। কাউন্টারের পেছনে বসে থাকা রিসেপশনিস্টরা ক্রমাগত বেজে চলা টেলিফোন ধরছে আর কম্পিউটারে খটাখট টাইপ করছে।


তিতাস চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে নিজের কাঁধের ব্যাগটা একটু গুছিয়ে নেয়। তারপর আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে মেইন রিসেপশন ডেস্কের দিকে এগিয়ে যায়। কাউন্টারে থাকা এক তরুণীর দিকে তাকিয়ে বিনীত অথচ স্পষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করে, "এক্সকিউজ মি, ডেটা কো-অর্ডিনেটর পদের জন্য যে ইন্টারভিউটা চলছে.. সেটা ঠিক কোন ফ্লোরে হচ্ছে একটু বলতে পারবেন?"

রিসেপশনিস্ট মেয়েটি কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়ে যান্ত্রিক ভঙ্গিতে বলে, "আপনার বাঁ দিকের লিফটটা নিয়ে সোজা সেকেন্ড ফ্লোরে চলে যান ম্যাম। ওখানেই এইচআর ডিপার্টমেন্ট।"

"ধন্যবাদ," বলে তিতাস বাঁ দিকের লিফটের দিকে এগিয়ে যায়। 

প্রায় এক ঘণ্টা পর হাসপাতালের কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসে তিতাস। ওর মুখে এখন একটা শান্ত, তৃপ্তির হাসি। ডক্টর আর এইচআর ম্যানেজারের সাথে ইন্টারভিউটা বেশ ভালো হয়েছে। ওনারা তিতাসের কনফিডেন্স আর কথার সাবলীলতা দেখে বেশ ইমপ্রেসড। মাইনেটা খুব একটা বেশি নয়, মাসে কুড়ি হাজার টাকা। কিন্তু তিতাসের কাছে এই মুহূর্তে টাকার অঙ্কের চেয়েও নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা বেশি জরুরি।

'কুড়ি হাজার তো কী হয়েছে!' তিতাস মনে মনে নিজেকে বোঝায়। 'এটা তো সবে শুরু। এখান থেকে এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে পরে আরও ভালো কোনো পোস্টে, ভালো স্যালারিতে চলে যেতে পারব। অন্তত নিজের হাতখরচ আর ছোটখাটো শখগুলোর জন্য তো আর কারও কাছে হাত পাততে হবে না!'


দুপুরের কড়া রোদটা যেন পিচ গলা রাস্তার ওপর থেকে সোজা এসে মুখে ঠিকরে পড়ছে। ইন্টারভিউ শেষ হতে হতে বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেছে। বাস স্টপেজের শেডের নিচে দাঁড়িয়ে ব্যাগের থেকে রুমাল বের করে মুখের ঘাম মোছে তিতাস। শেডের নিচে গুটি কতক মানুষ নিজেদের মধ্যে গুঁতোগুঁতি করে ছায়ার আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করছে।

তিতাসের চোখ রাস্তার মোড়ের দিকে, যদি কোনো বাস চোখে পড়ে। কিন্তু বাসের দেখা নেই, আছে কেবল গাড়ির হর্ন আর ধোঁয়ার আস্ত আবরণ।

ঠিক এই সময় তিতাসের পাশে এসে দাঁড়ায় বাইশ-তেইশ বছরের এক যুবক। পরনে ছেঁড়া ডেনিম আর একটা উজ্জ্বল টি-শার্ট, চুলে হালকা জেল দেওয়া। বেশ কিছুক্ষণ ধরে দূরে দাঁড়িয়ে তিতাসকে লক্ষ্য করছিল লোকটা। এবার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করে বিড়বিড় করে বলে, "আজকে রোদের তাপটা বড্ড বেশি, তাই না ম্যাম?"

তিতাস কোনো উত্তর দেয় না। উত্তর দেওয়া তো দূর, লোকটার দিকে ফিরে তাকায়ও না। একটু সরে গিয়ে নিজের ব্যাগের ফিতেটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে।

লোকটা কিন্তু ছাড়ার পাত্র নয়। মুখ থেকে ধোঁয়া ছেড়ে হালকা হেসে আবার বলে ওঠে, "হাসপাতাল থেকে বেরোতে দেখলাম আপনাকে। কোনো পেশেন্ট দেখতে এসেছিলেন? সময় থাকলে চলুন এক কাপ কোল্ড ড্রিঙ্কস খেয়ে আসি। পাশে এসি ক্যাফে আছে। একটু গল্প করি। নিজেদের চেনা-পরিচিতি বাড়াই।"

তিতাসের সারা শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে। এমনিতেই সকাল থেকে মানসিক ঝড় বয়ে গেছে ওর ওপর দিয়ে, তার ওপর এখন এই উটকো ঝামেলা সহ্য করার মতো বিন্দুমাত্র ধৈর্য ওর নেই। লোকটার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে তিতাস নিজের ট্রাজেক্টরি বদলে ফেলে। আর এক মুহূর্ত এই বাস স্টপেজে দাঁড়ানো নিরাপদ নয় বোঝামাত্র দ্রুত পায়ে হেঁটে সোজা সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

'এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে পরের বাস স্টপটা ধরি। ভিড়টাও সেখানে একটু বেশি হবে, আর এই আপদটার হাত থেকেও রেহাই মিলবে,' মনে মনে হিসাব কষে তিতাস।

পায়ের গতি অনেকটা বাড়িয়ে দেয় সে। চড়া রোদের মধ্যে প্রায় মিনিট সাতেক এক টানা হাঁটার পর পরের বাস স্টপটায় এসে পৌঁছায়। ভাগ্য ভালো, এখানে মানুষজনের আনাগোনা বেশ ভালোই। তিতাস একটা বড় হাঁপ ছেড়ে মাথার ওপর ছাতাটা মেলে ধরে নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করে। মোবাইলটা বের করে বাসের অ্যাপে টাইম চেক করতে শুরু করে।

কিন্তু সেই স্বস্তি বেশি ক্ষণ স্থায়ী হয় না।

হঠাৎ চোখের কোনায় একটা পরিচিত অবয়ব ধরা পড়তে তিতাসের শরীরের রক্ত হিম হয়ে যায়। ফুটপাতের ধার ধরে ঢং ঢং করে হেঁটে আসছে সেই অসভ্য লোকটাই।

লোকটা সরাসরি তিতাসের চোখের দিকে তাকিয়ে হালকা করে হাত নাড়ে। তিতাসের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। লোকটা অনায়াসে ওকে ফলো করছে!

ভয়ে তিতাসের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে। লোকটা যেভাবে একরোখাভাবে পিছু নিয়েছে, তাতে এখানে দাঁড়িয়ে থাকা মারাত্মক বিপজ্জনক। মাথার ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যায়। চারপাশের কোলাহলগুলোকে হঠাৎ খুব দূরে বলে মনে হয়।
কোনো উপায় না পেয়ে তিতাস নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর একটা মরিয়া চেষ্টা করে। কাঁপাকাঁপা হাতে ব্যাগ হাতড়ানোর ভান করে ও একটু একটু করে পেছাতে থাকে, তারপর ভিড়ের গভীরে ঢুকে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করে।

তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করতে গিয়ে চেনে হ্যাঁচকা টান পড়ে। আর ঠিক তখনই ব্যাগ থেকে একটা ছোট ভিজিটিং কার্ড খসে সোজা পিচ রাস্তার ওপর গিয়ে পড়ে।

তিতাসের চোখ যায় সেখানে। অ্যাডভোকেট রুদ্র রায়। 

নামটা পড়ে দ্বিতীয়বার কোনো কিছু ভাবার বিন্দুমাত্র সময় থাকে না। বিদঘুটে লোকটা আর মাত্র কয়েক কদম দূরে। ভয়ে হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। তিতাস বিদ্যুৎগতিতে নিচু হয়ে কার্ডটা তুলে নেয়। ফোন স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে এক সেকেন্ড নষ্ট না করে কার্ডে প্রিন্ট করা নম্বরটাতে সোজা ডায়াল করে বসে।

'প্লিজ... ফোনটা ধরো...' কানের কাছে রিংটোন বাজার শব্দটার সাথে সাথে তিতাসের রুদ্ধশ্বাস বুক কাঁপতে থাকে।

"হ্যালো, কে বলছেন?"

"আমি... আমি তিতাস!"

বালিগঞ্জের কাছে নিজের চেম্বারে বসে তখন একটা জরুরি ক্লায়েন্টের ফাইল ঘাঁটছে রুদ্র। সকালে তিতাস চলে যাওয়ার পর সে তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরে জলখাবার খেয়ে সোজা এখানে চলে এসেছে। আজ কোর্টে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে। এই ব্যস্ততার মাঝে টেবিলে রাখা পার্সোনাল ফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনে অজানা নম্বর দেখে রিসিভ করে রুদ্র। কিন্তু ওপাশ থেকে প্রথম কয়েক সেকেন্ড জোরে জোরে নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া বাকি কোনো শব্দ আসে না। ফোনটা কান থেকে নামিয়ে একবার কলার আইডি চেক করে রুদ্র।

"হ্যালো, কে?"

"রুদ্র... রুদ্র আমি তিতাস।"

তিতাসের গলা শুনে রুদ্রের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। মেয়েটা তাকে এমন ভরদুপুরে ফোন করবে সে আশা করেনি।


"তিতাস? কী ব্যাপার? আমার মতো স্টকারের কথা হঠাৎ মনে পড়ল যে?"

কিন্তু রুদ্রর ঠাট্টা ভরা হাসি এক সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে যায়। ফোন থেকে তিতাসের উত্তরের বদলে ভেসে আসে একটা বখাটে ছেলের কর্কশ গলা,

"আরে ম্যাডাম! পালালেন কেন? আমি তো আপনাকে ক্যাফেতে নিয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কসের অফার করলুম। কোথায় থ্যাঙ্ক ইউ জানাবেন, তা না করে সোজা এখানে চলে এলেন! চলুন, এখানেই সামনে যাওয়ার দারুণ জায়গা আছে..."

মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় রুদ্রর মুখের অবয়ব। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, চোখের চাহনিতে নিমেষে ফুটে ওঠে ক্ষোভ। ফোনের ওপর হাতের মুঠো শক্ত করে চেপে ধরে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, "কোথায় তুমি তিতাস?"

ওপাশ থেকে প্রায় কেঁদে ফেলে তিতাস, "বালিগঞ্জ... বালিগঞ্জ বাস স্টপ এরিয়া টু! প্লিজ... প্লিজ তাড়াতাড়ি আসুন! আমার খুব ভয় করছে!"

ঠিক তখন আবার সেই লোকটার গলা ফোন দিয়ে স্পষ্ট ভেসে আসে, "আরে ম্যাডাম! কার সাথে এত কথা বলছেন শুনি? চলুন তো..."

"হাত ছাড়ুন আমার! মোটেও ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। রুদ্র... কোথায় তুমি?!"


এক সেকেন্ডও দেরি করে না রুদ্র। এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। চেম্বার থেকে বেরোনোর মুখে দুজন জুনিয়র অ্যাডভোকেট কথা বলার জন্য এগোতে রুদ্র তাদের হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দেয়। কাউকে কোনো উত্তর না দিয়ে প্রায় একপ্রকার দৌড়ে পার্কিং লটের দিকে নেমে যায়।

বাইকের ইঞ্জিনে চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দেওয়ার সাথে চাকা ঘোরে সোজা রাস্তার দিকে। ফোনটা স্পিকারে দিয়ে পকেটে গুঁজে তীব্র গতিতে এক্সিলারেটর মোচড় দিয়ে গর্জে ওঠে সে, "তিতাস! ভিড়ের মধ্যে থাকো। একা কোথাও যাবে না একদম! আমি আসছি... জাস্ট দু’মিনিট দাও আমাকে!"