Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

তেরো নম্বর ঘর - পর্ব 8

ইন্সপেক্টর অনিকেত টর্চের আলো ছেলেটির মুখে ফেলল। ছেলেটি ধীরে ধীরে মাথা কাত করলো।

তারপর এমনভাবে হাসল, যেন সে কোনো মজার কথা শুনেছে। সে হাততালি দিলো।

তারপর হাসতে হাসতে ছেলেটা বললো  , "আপনারা সবাই এখানে এসেছেন?  খুব ভালো। এবার সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাবে।"

ইন্সপেক্টর অনিকেত কোমর থেকে পিস্তল বের করলো । ছেলেটি হাসতে হাসতে পিছিয়ে গেলো।

ইন্সপেক্টর অনিকেত ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করলো , "তুমি কে?"

ছেলে টা বললো  , "আপনি জানেন না?"

তারপর ছেলেটা নিজের মুখের উপর হাত বুলিয়ে দিলো। মুখের উপর হাত বোলাতেই ছেলেটার মুখের চামড়া যেনো মোমের মতো গলতে শুরু করলো ।

ছোট্ট মুখটা বদলে গেলো। তার জায়গায় দেখা দিলো একটি কিশোরীর মুখ।

লাল চুড়ি। কপালে রক্ত। চোখে গভীর কালো গর্ত।

কুসুম …।

মৃণালিনী দেবী মেঝেতে বসে পড়ল।

তারপর বললো  , "তুমি..."

কুসুমের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো  একটি অদ্ভুত শব্দ। একসঙ্গে কান্না আর হাসির মতো।

তারপর কুসুম বললো  , "আপনি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, মৃণালিনী দেবী। কিন্তু আপনি পারেননি।"

তারপর সে অনুব্রত দিকে তাকালো।

"আর তুমি... তুমি তো তখন ছোটো ছিলে। তোমার কোনো দোষ ছিল না।" কুসুম বললো ।

অনুব্রত কাঁপা গলায় বললো , "তাহলে তুমি সুকান্ত , হরিপদবাবু আর ড. অর্ণব সেন কে মেরেছো ?"

কুসুম মাথা নেড়ে বললো  , "আমি কাউকে মারিনি , কিন্তু তারা মারা গেছে ! মৃত্যু তাদের কাছে গেছে। আমি শুধু তাদের মনে করিয়ে দিয়েছি, তারা কী করেছিলো ।"

ইন্সপেক্টর অনিকেত গর্জে উঠল , "তুমি যদি খুন না করে থাকো, তাহলে কে করেছে?"

কুসুমের হাসি থেমে গেলো। সে ধীরে ধীরে নিজের পিছনের অন্ধকারের দিকে তাকালো।

তারপর কুসুম বললো  , "যে দরজা বন্ধ করেছিলো ।"

অনুব্রতর মাথার ভিতর সবকিছু ঘুরতে লাগলো ।

বাবা মারা গেছেন।

সুকান্ত মারা গেছে।

হরিপদবাবু মারা গেছে।

ড. অর্ণব সেন মারা গেছে।

তাহলে কে?

হঠাৎ তার মনে পড়ল, বাবার চিঠি।

'যদি কখনো ভিতর থেকে তোর মায়ের গলা শুনতে পাস, কোনোভাবেই উত্তর দিবি না।'

কিন্তু কেন?

যদি মা বেঁচে থাকেন, তবে তাঁর গলা শুনে উত্তর দিতে নিষেধ কেন?

অনুব্রত ধীরে ধীরে মৃণালিনী দেবীর দিকে তাকালো।

মৃণালিনী দেবী তখনও কাঁপছিলো।

অনুব্রত মৃণালিনী দেবী কে জিজ্ঞাসা করলো , "মা, সেদিন রাতে তেরো নম্বর ঘরের দরজা কে বন্ধ করেছিলো ?"

মৃণালিনী দেবী উত্তর দিলো না। তারপর মৃণালিনী দেবী মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলো।

মৃণালিনী দেবী  বললো  , "আমি চাইনি..."

অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো , "কী চাওনি মা ?"

মৃণালিনী দেবী বললো  "আমি চাইনি সে মরুক!"

অনুব্রত জিজ্ঞাসা করলো "কে ?

মৃণালিনী ধীরে ধীরে মুখ তুলল।

তারপর বললো  , "তুই।"

অনুব্রতর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো। সুড়ঙ্গের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এলো ।

"আমি?" অনুব্রত ফিসফিস করে বললো ।

"সেদিন রাতে তুই ঘুম থেকে উঠে আমাদের খুঁজতে এসেছিলি। তুই দেখেছিলি, তোর বাবা কুসুমকে মারছে। তুই চিৎকার করেছিলি। তুই পুলিশ ডাকতে চেয়েছিলি।"

মৃণালিনী দেবী কাঁদতে লাগলো ।

"তোর বাবা তোকে তেরো নম্বর ঘরে আটকে রাখতে চেয়েছিল। আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। তাই তোকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু..."

অনুব্রত আবার জিজ্ঞাসা করলো , "কিন্তু কী?"

তারপর আবার মৃণালিনী বলতে শুরু করলো , "দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।"

অনুব্রত  বললো  , "কে বন্ধ করেছিলো ?"

মৃণালিনী চোখ বন্ধ করলো।

"তুই।"

অনুব্রত পিছিয়ে গেলো।

অনুব্রত বললো  , "না! আমি তো তখন দশ বছরের!"

মৃণালিনী দেবী বললো  , "তুই ভয় পেয়েছিলি। তুই ভেবেছিলিস, কুসুম তোকে ধরতে আসছে। তুই দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলি। কিন্তু তুই জানতিস না, ভিতরে কুসুম আর আমি দুজনেই আটকে পড়েছিলাম।"

অনুব্রতর মাথায় পুরোনো স্মৃতিগুলো ঝড়ের মতো ফিরে এলো ।

মায়ের চিৎকার। কাঠের দরজা। কেউ একজন দরজার ওপাশ থেকে কাঁদছে। অনুব্রত দৌড়ে পালাচ্ছে। তারপর অন্ধকার। তারপর বাবার গলা।

মৃণালিনী দেবী বললো , 'তুই কিছু দেখিসনি, অনুব্রত। সব স্বপ্ন!'