Love Unlocked :5
Pritha 🎀:
আরিয়া এখন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাফের মধ্যে স্টাফদের জন্য নির্বাচিত জায়গাটায়। এখানেই কফি বানানো হয়। এখান থেকে সামনের হলঘরটা সম্পূর্ণ দেখা যাচ্ছে। ওখানে এখন প্রচণ্ড ভিড়। সবাই মেতে আছে দেবর্ষিকে নিয়ে। তার কি প্রয়োজন কি লাগবে সেইসব দিকে খেয়াল রাখছে। বিশেষ করে মেঘা তো পুরো হামলে পড়ছে। বাকি স্টাফেরাও কম যায়না। দূর থেকে ভিড়ের মধ্যমণি দেবর্ষির বিরক্তিভরা মুখটা দেখে বিড়বিড় করে উঠলো "উম ঢং দেখো! এত অ্যাটেনশন পাচ্ছে ভালোই তো এনজয় করছে মাঝে আমি খারাপ হয়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি এসে পড়েছিস ভালো কথা আমায় বলবি তো যে তুই বস। সেসব এর বালাই নেই। আবার হুমকি দিচ্ছে! যত্তসব।"
"কিরে কি ভাবছিস তুই এত! গেস্ট অ্যাটেন্ড করতে গেলি না ! তাও আবার স্পেশাল গেস্ট বলে কথা! ভাই কি বলব তোকে, কি ফিগার ! কি দেখতে মাইরি পুরোই আগুন"(সোনালী)
"এই তুই চুপ করবি ?আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে আর ও পড়েছে ছেলে দেখতে।"(আরিয়া)
"উল্টো পাল্টা কাজ করলে মাথা তো ফাটবেই। কত ইশারা করে বললাম বাজে বকিস না চুপ কর, মুখে তালা দে একটু। তুই থামলে তো!"(সোনালী)
"এবার আমার কি হবে রে ! আমার কাজটা বোধহয় গেলো...!"(আরিয়া)
"কোনো কাজ না করে এখানে বসে থাকলে কাজটা কিভাবে থাকবে হুম ?!"
কারোর গলার আওয়াজ পেয়ে দুজনেই ফিরে তাকায় দরজার দিকে। দরজার একদিকে হেলান দিয়ে পা ক্রস করে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছেলে।
"একি স্যার আপনি এখানে, কিছু লাগবে আপনার ?" ব্যস্ত কন্ঠে সোনালী বলে উঠলো।
"এই আপদটা আবার কে !" আড় চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো আরিয়া।
"আজ্ঞে মিস আমি আপদ নই। তখনের কথাটা মজা করে বলেছি সরি কিছু মনে করবেন না। হ্যালো আমি আবির, দেবর্ষি স্যারের এসিস্ট্যান্ট।" বলে হাত বাড়িয়ে দিলো আবির।
আরিয়া চুপ করে আছে দেখে শেষে সোনালী হাতটা মিলিয়ে মেকি হেসে জবাব দিলো "হাই আমি সোনালী, ও আরিয়া। আপনার কিছু লাগবে ?"
"উনি কি বোবা ! উত্তর দিতে কি সমস্যা ! যাই হোক ওখানে স্যারকে যেভাবে ছেঁকে ধরেছে সবাই এতে আমাদের সমস্যা হবে। একটু পরেই ক্লায়েন্ট চলে আসবে তাই এসব ফুল দেওয়া হেনতেন রিচুয়ালস বন্ধ করলে ভালো হয়। নইলে স্যার রেগে যাবেন এবার।তাই এখানে আপনাদের দুজনকে একা দেখে হেল্প চাইতে এলাম।ওখানে তো সবাই স্যারকে নিয়ে এতই ব্যস্ত যে আমার কথা তো দূরে থাক স্যারের কথাই কারোর কানে যাচ্ছে না,উল্টে স্যার আমার উপর রাগ করছেন।" কথাটা বলতে বলতে হেসে ফেলল আবির। ব্যাপারটা ওর নিজের কাছেই একটু বোকা বোকা লাগছে। এমন আপ্যায়ন চলছে যে ওদের কথাই শুনতে চাইছে না কেউ। কিন্তু বেচারার কিছু করার নেই। ওর স্যারকে এই জায়গা থেকে উদ্ধার না করলে ওর চাকরি কেউ উদ্ধার করতে পারবে না।
"এরম কথায় কথায় হাসেন কেন ! বিশ্বাস করুন একদম ভালো লাগে না দেখতে।" বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে বলে ওঠে আরিয়া।
আরিয়ার কথায় আবির সোনালী দুজনই একটু ভরকে গেলো।সোনালী কপাল চাপড়ানো ছাড়া উপায় পেলো না। এই মেয়ে চাইছে টা কি ! প্রথম দিনকেই শেষ দিন বানানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তখন ওতো বড় একটা কাণ্ড ঘটিয়েও দমার মেয়ে নয়। আবার স্যারের অ্যাসিস্ট্যান্টকেও হাবিজাবি বলছে। এখুনি নালিশ ঠুকে দিলে নিজে তো ডুববেই ওকেও ডোবাবে।
"স্যার আপনি বরং আমার সাথে আসুন আমি কোনো একটা ব্যবস্থা করছি। আসলে ওর মুডটা আজ ঠিক নেই তো উল্টো পাল্টা বলছে"(সোনালী)
"এই না না আমায় স্যার বলতে হবে না। আমি ওতো ফরমাল নই। ওই যে পরিচয় দিলাম,আবির। আমায় আবির বলেই ডাকবেন।"
"ঠিক আছে আপনি আসুন।"
.
সোনালী ওর কথামত সত্যি মেঘাকে বুঝিয়ে জায়গাটা ফাঁকা করার ব্যবস্থা করে দিলো। কারণ সবার থেকে বেশি উত্তেজিত মেঘাই হয়ে ছিল। এরপর সব স্টাফেরা আবার নিজেদের জায়গায় ফিরে এল। হলঘরটা মিটিং এর জন্য ফাঁকা করে দিলো। কিছুক্ষণ পর একজন স্যুটবুট পরা লোক ঢুকতে দেবর্ষি তাকে নিয়ে পার্সোনাল কেবিনে চলে গেলো। এরপর যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেও মেঘার কথা মত দেবর্ষি না যাওয়া পর্যন্ত কোনো স্টাফ ছুটি নিতে পারবে না। কিন্তু আরিয়ার মনটা একদম টিকতে চাইছে না।
একটু পরে আবার আবিরের দেখা পাওয়া গেল। দেবর্ষি আর ওর ক্লায়েন্টের জন্য দুকাপ ক্যাপাচিনো পাঠানোর কথা বলে ও আবার কেবিনে ঢুকে গেলো। আরিয়া চুপচাপ এক জায়গায় বসে। আজ স্টাফদের অভাব নেই। সকাল বিকেল দুই বেলার স্টাফই হাজির হয়েছে। সবাই মিলে কাজ করতে গেলে অতি সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্টের মত ব্যাপারটা হয়ে যাবে। তাই ও চুপ চাপ একটা টেবিলের কর্নারে বসে বসে এইসবই ভাবছিল। এমন সময় সোনালী ওর সামনে দুইকাপ ক্যাপাচিনো সাজিয়ে রাখতে অবাক দৃষ্টিতে আরিয়া সোনালীর দিকে তাকালো।
"স্যার আসার পর থেকে এরম থম মেরে আছিস। গেস্ট তো তোকেই অ্যাটেন্ড করতে হবে। যা গিয়ে দিয়ে আয়।"(সোনালী)
"এতজন আছিস আমাকেই যেতে হবে !"(আরিয়া)
"এখানে কেউ তোর মত স্মুথ না। গেস্ট অ্যাটেন্ড করাটা ব্যাপার না, কিন্তু স্যার যেভাবে রাগ দেখাচ্ছে কেউ হ্যান্ডেল করতে পারছে না। তার উপর এখন আবার ক্লায়েন্ট আছে । আরোই কেউ সাহস পাচ্ছে না। তোকেই যেতে হবে।"
"কিসের এত মিটিং ! ধুর আমার হয়েছে যত জ্বালা।" বলতে বলতে বিরক্তি মুখে উঠে দাড়ালো আরিয়া।
"তুই জানিস না আমাদের স্যার, মানে দেবর্ষি সিংহ রায় রূপকথা ফেব্রিক্স এর ওনার? পুরো নিজের ক্ষমতায় একা একটা কোম্পানি দাঁড় করিয়ে সবথেকে ইয়ং হ্যান্ডসাম সাক্সেসফুল ম্যান এর আওয়ার্ড পেলো কদিন আগে ! এখন তো ওনার কোম্পানি দেশে বিদেশে রমরমা। ম্যাগাজিনের তো ছবি বেরোলো কদিন আগে। কয়েকটা ব্রাঞ্চও রয়েছে এর। রূপকথা ফেব্রিক্স এর নাম কে না জানে ! সেখানেরই হয়তো কোনো মিটিং হবে।"
"রূপকথা ফেব্রিক্স ! মানে টপ ফাইভ এর মধ্যে যে ফ্যাশন ডিজাইনিং কোম্পানিটা আছে সেটা ? ওখানে কাজ পাওয়া তো আমার ড্রিম জব রে ! আমাদের গ্রেনফিল্ড কলেজ থেকে একজন ওই কোম্পানিতে প্লেসমেন্ট পেয়েছে শুনেই তো ওখানে এডমিশান নিয়েছিলাম আমি! কি বলছিস তুই !"
"তুই গ্রিনফিল্ড কলেজে পড়িস ! কই বলিসনি তো ? আমিও তো সেম কলেজ। আমি সেকেন্ড ইয়ার, তুই ?"
আরিয়া এবার চুপ করে গেলো। ভুল করে আবেগের বশে নিজের পার্সোনাল ডিটেইলস দিয়ে ফেলেছে ভেবেই বিষয়টা এড়িয়ে যেতে সামনে রাখা কফির ট্রে টা নিয়ে যেতে যেতে বলে উঠলো "ফার্স্ট ইয়ার! "
.
দরজাটা ঠেলে কেবিনে ঢুকলো আরিয়া। বাইরে এত গরমের মধ্যে এই ঘরের এসির ঠান্ডা হাওয়াটা হঠাৎ করেই হাঁড় কাপিয়ে দিল। এগিয়ে এসে কফিদুটো ট্রে থেকে নামিয়ে সার্ভ করে ট্রে টা হাতে নিয়ে মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে হাসি মুখে বলে উঠলো "এনজয় ইওর ডে স্যার"
দেবর্ষি স্বভাববশত চুপ থাকলেও বিদেশী লোকটি বলে উঠলো "থ্যাঙ্ক ইউ"।
এর পর আরিয়া ট্রে টা নিয়ে বাইরে বেরোতেই যাবে এমন সময় একটা কথা শুনে পা দুটো থেমে গেলো।
"Don't you think a big company like this should have a tagline?" (বিদেশী লোকটি)
"ট্যাগলাইন তো কোম্পানির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এটা মানে তো কোম্পানির পরিচয় একটা ছোট বাক্যে গ্রাহকদের বোঝানো। যাতে মানুষ নাম শুনলে প্রথমেই সেটা মনে করতে পারে। তাছাড়া, একটা ক্যাচি ট্যাগলাইন ব্র্যান্ডকে আলাদা করে আর গ্রাহকদের মনে ঝটপট জায়গা করে নেয়। রূপকথা ফেব্রিক্স সুতোর ছোঁয়ায় জেগে ওঠে রূপকথার গল্প।" (আরিয়া)
কথাগুলো অনর্থক ভাবেই বলে ফেলেছে বুঝতে পেরে নিজের মুখে নিজেই হাত চাপা দিয়ে দেয় আরিয়া। অবশ্য শেষের কথাটা আস্তেই বলেছিল। কিন্তু ওর তো এগুলো বলার কোনো দরকারই ছিল না। আসলে নিজের পছন্দের বিষয়ে এমন চর্চা হলে নিজের মনের ছটফটানি ভাবটা বোধহয় দমানো যায়না। তাই নিজের দোষ ঢাকতে একপ্রকার দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
কিন্তু তাতে আর কি লাভ যাদের শোনার তারা শুনেছেই। বিদেশি লোকটি বাংলায় বলা শব্দ গুলো না বোঝায় ওতো পাত্তা না দিলেও দেবর্ষির মুখ থেকে বেরিয়ে আসে "ইমপ্রেসিভ"
কিন্তু যার উদ্দেশ্যে বলা তার কানে গেলো কি ?!
.
.
.
.
চলবে....