মিশন ইন্ডিয়ানা****************
পর্ব - 1
********
Come Back To Earth
***********************
স্বর্ণাভ বিশ্বাস উদ্বিগ্ন হয়ে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন। আর মাত্র কিছুক্ষণের অপেক্ষা। একটা ইতিহাস সৃষ্টির দিকে এগিয়ে চলেছে আমাদের দেশ। স্বর্ণাভ নিজের হার্ট বিট একটু বেশি অনুভব করলেন। সেটা হওয়াই তো স্বাভাবিক। তিনি শুধু এই ইতিহাসের সাক্ষী নন, বরং এই ইতিহাস সৃষ্টির মধ্যে এক অমূল্য যোগদান রয়েছে তার। তার মনে পড়ছে আজ থেকে ঠিক বছর খানেক আগেকার কথা। মৃত্যুঞ্জয় ভৌমিকের সাথে লম্বা মিটিং হয়েছিল। একবার না, একাধিকবার। স্বর্ণাভ জানতেন না তার স্বপ্ন পূর্ণতা লাভ করবে কি না। হঠাৎ সেই রাতে মৃত্যুঞ্জয়ের ভিডিও ম্যাসেজ এলো স্বর্ণাভের কাছে।
'মিস্টার বিশ্বাস! ইউ মে প্রসিড।'
ছোট্ট একটা ম্যাসেজ। এই ছোট্ট একটা ম্যাসেজ ভারতবর্ষকে ঠেলে দিয়েছিল এক ইতিহাস সৃষ্টির দিকে।
মনিটারের সামনে বসে থাকা মেয়েটা হঠাৎ বলে উঠলো - 'স্যার, ভ্যালিয়েন্টের ক্যাপ্টেন মিস গাঙ্গুলী ম্যাসেজ পাঠিয়েছেন।'
'কী ম্যাসেজ?' স্বর্ণাভ বিশ্বাসের উদ্বিগ্নতা আরো বাড়লো।
'তারা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবীর আ্যটমোসফিয়ারের মধ্যে প্রবেশ করে যাবে। ওয়েটিং টাইম 5 মিনিটস।' মেয়েটি বললো।
'ভিডিওটা একবার অন করে তাদেরকে দেখাও।' স্বর্ণাভের কোথা মত সামনের মনিটারে বসে থাকা মেয়েটা নিজের পাশের দেওয়ালে ঝুলতে থাকা বিশাল স্ক্রিনটা অন করলো। নিমেষের মধ্যে স্বর্ণাভ এবং তার সম্পূর্ণ টিম ভ্যালিয়েন্ট নামের স্পেসক্রাফ্টের ভিতরে থাকা ক্যাপটেন নীহারিকা গাঙ্গুলী এবং তার ছয় জনের ক্রিউকে দেখতে পেলো।
'কংগ্রাচুলেশন টু অল অফ ইউ। গ্রেট জব।তোমাদের ক্যাপসুল বে অফ বেঙ্গলে ল্যান্ড করবে, যেমনটা আগে বলেছিলাম। ল্যাটিটিউড আর লঙ্গিটিউড তোমাদের দেওয়া আছে। রেসকিউ টিম সেখানে তোমাদের অপেক্ষা করছে। বেস্ট অফ লাক।' ক্যাপ্টেন নীহারিকা গাঙ্গুলী'র টিমের দিকে লক্ষ্য করে মিস্টার বিশ্বাস বললেন।
নিজের হেলমেটের ভিতর থেকে নীহারিকা একবার ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকালো মিস্টার বিশ্বাসের দিকে।
'রজার স্যার।' বললো নীহারিকা।
মিস্টার বিশ্বাসের সামনের এক মনিটারের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। যান্ত্রিক মেয়েলি গলায় তিনি শুনতে পেলেন - 'টেন, নাইন, এইট, সেভেন, সিক্স, ফাইভ, ফর, টু, ওয়ান, জিরো....'
দেওয়ালে ঝুলতে থাকা বড় মনিটার হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল। নীহারিকা নিজের ক্রিউ মেম্বারদের নিয়ে পৃথিবীর আ্যটমোসফিয়ারের মধ্যে প্রবেশ করে গেছে। এবার কিছুক্ষণ তাদের সাথে আর কোনো ভাবে কন্ট্যাক্ট করা সম্ভব না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মিস্টার বিশ্বাস। কিছুক্ষণ পর মনিটারের কাছে বসে থাকা মেয়েটিকে বললেন - 'রেসকিউ টিমের সাথে যোগাযোগ করো। রাইট নাও।'
রেসকিউ টিমের সাথে যোগাযোগ হওয়ার পর তিনি বললেন - 'তারা আ্যটমোসফিয়ারে ঢুকে গেছে।'
'উই আর রেডি স্যার।' অপ্রান্ত থেকে জবাব এলো।
এবার মিস্টার বিশ্বাস নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কাউন্টডাউন শুরু করলেন। যতক্ষণ না তাদের ঠিক মত ল্যান্ড করে যাওয়ার খবর তিনি পাচ্ছেন, ততক্ষণ মনে শান্তি নেই।
********************************
'এই বেশ কিছু বছরে স্পেস সাইন্সে আমাদের দেশ যা উন্নতি করেছেন সেটা খুব ভালো ভাবেই আপনারা দেখতে ও বুঝতে পারছেন। একটা সময় এমন ছিল যখন আমরা চাঁদে ম্যান মিশন করার বিষয় ভাবতেও পারতাম না। হ্যাঁ, কিছু চন্দ্রযানের সফল ল্যান্ডিং আমরা চাঁদে অবশ্যই করে ফেলেছিলাম। কিন্তু যত দিন এগোয়, ততো আমরা বিজ্ঞানে উন্নতি করি। চাঁদে ম্যান মিশন আমরা সফল ভাবে করি। তারপর আমরা মঙ্গলে পারি দিই। কিন্তু মঙ্গল পর্যন্ত যাওয়াই আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল না। আমাদের যেতে হতো আরো আগে। এই মহাকাশে লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। সেই রহস্যভেদ করতে হতো আমাদের। কথাটা শুধু রহস্যভেদ পর্যন্ত সীমিত না। কথা হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যতের। আমাদের দূর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আমাদের এই মিশনটা করতে বাধ্য করেছে। টাইটান একটা এমন উপগ্রহ যাতে আ্যটমোসফিয়ারের সন্ধান বহু বছর আগেই পাওয়া গিয়েছিল। শুধু আ্যটমোসফিয়ার নয়, সেখানে আমরা সন্ধান পেয়েছিলাম জলেরও। হ্যাঁ, সেটা পৃথিবীর মত H₂O না হতে পারে, কিন্তু সেটা যে জল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা এটা জানি যে টাইটানের বায়ুমণ্ডল মূলতঃ নাইট্রোজেন দিয়ে তৈরি। ঘন বায়ুমণ্ডল সেখানে। আমরা এই পৃথিবীর ভবিষ্যতের বিষয় ভেবে টাইটানের উপর আরো রিসার্চ করবো। আমরা রিসার্চের মূল উদ্দেশ্য হবে, টাইটানে কি আদৌ জন বসতি গড়ে তোলা সম্ভব? যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেটা কী করে সম্ভব? আমাদের এই টিম টাইটানে গিয়ে আরো অনেক নতুন তথ্য নিয়ে এসেছে। সেই তথ্য গুলো কী, সেটা পরে জানানো হবে। আপাতত এত দূর থাক আজ।'
একটা সাংবাদিক সম্মেলনে নিজের বক্তব্য রাখলেন স্বর্ণাভ বিশ্বাস। তার বক্তব্য শেষ হতে না হতেই এক পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ছেলে সাংবাদিক নিজের ডান হাত উপরে তুলে বললো - 'আই হ্যাভ এ কোয়েশ্চেন স্যার।'
'ইয়েস প্লিজ।' বললেন মিস্টার বিশ্বাস।
'স্যার, আমার যতদূর স্টাডি আছে, সেটার বেসিসে যদি বলি তাহলে আজ থেকে প্রায় তিরিশ-পয়ন্ত্রিশ বছর আগেও টাইটানে একটা ম্যান মিশন করা হয়েছিল। সেটার বিষয় একটু আলোকপাত করবেন? আ্যসট্রনটদের পৃথিবীতে ফিরে আসার পর অদ্ভুত ভাবে সেই ঘটনাটাকে চেপে দেওয়া হয়। কোনো নিউজ চ্যানেল, কোনো খবরের কাগজকে এই বিষয় কোনো খবর দেওয়া হয় না। শুধু বলা হয়, সবটাই নাকি কনফিডেন্সিয়াল।'
একটু চুপ থেকে মিস্টার বিশ্বাস বললেন- 'দেখুন, সে সময় কী হয়েছিল সেটা আমার জানা নেই। তখন আমি স্টুডেন্ট। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে তখন আমাদের এই সংস্থা টাইটান নামক শনির উপগ্রহে ম্যান মিশন করেছিল। সবই এখন ক্লাসিফাইড। তবে এই মিশনের আমি প্রজেক্ট ম্যানেজার। তাই বুক ঠুকে এটা বলতে পারি যে আমাদের এই "মিশন টাইটান" পুরো ভাবে সফল হয়েছে।'
'আমরা আ্যসট্রনটদের সাথে কবে দেখা করতে পারবো?' এক অল্প বয়সী মেয়ে সাংবাদিক প্রশ্নটি করলো।
'এখন তো দুদিন তারা কোয়ারেন্টাইন এ থাকবে। তারপর তাদের ফিজিক্যাল এবং মেন্টাল হেল্থ চেকআপ হবে। তারপর তাদের সাথে আলোচনা করে আমরা আপনাদের জানিয়ে দেবো।'
********************************
কলকাতার লেক গার্ডেন্স এলাকার এক বড় এপার্টমেন্টের সামনে কালো রঙের এক গাড়ি এসে থামলো। গাড়ির সামনের দরজা খুলে সেখান থেকে এক বন্দুকধারী গার্ড বেরোলো এবং সে পিছনের দরজাটা খুলে দিলো। গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো নীহারিকা গাঙ্গুলী। দুদিন করেন্টাইনে থাকার পর আজ সে নিজের বাড়ি ফিরেছে। বাড়িতে রয়েছে তার বিধবা মা এবং বহু পুরোনো এক কাজের মাসি। কাজের মাসি চব্বিশ ঘন্টা নীহারিকার মায়ের কাছেই থাকে। নীহারিকা তো অর্ধেক সময় বাড়িতে থাকেই না। হয়তো সে মহাকাশে, কিম্বা কলকাতাতে থাকলেও বেশিরভাগ সময় অফিসেই কেটে যায় তার। লিফ্ট দিয়ে নিজের ত্রিশ তলা ফ্ল্যাটে উঠলো নীহারিকা। নীহারিকার বয়স খুব বেশি হলে আঠাশ বছর। শরীরের গড়ন লম্বা। গায়ের রং খুব ফর্সা না হলেও, খুব কালোও নয়। মুখশ্রী ভালো। নীহারিকার বাবা ঋদ্ধিমান গাঙ্গুলী ইসরো'র (ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গনাইজেশন) ইস্ট্রান উইংয়ে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। নীহারিকার ছোট থেকেই তারাদের দেশ নিয়ে অনেক কৌতূহল। বাবার কাছে গ্রহ-নক্ষত্রের বিষয় ছোট বেলায় অনেক গল্প শুনতো। অজানা তারার দেশের প্রতি তার ভালোবাসা দিনে দিনে বৃদ্ধি পায়। অবশেষে সেও নিজের বাবার মত ইসরোতে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
'বাড়িতে যে মা আছে, সেটা তো ভুলেই গেছিস একেবারে।'
নীহারিকার মা শ্যামলী গাঙ্গুলী কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে নিজের মেয়ে নীহারিকাকে বললেন। নীহারিকা নিজের মাকে জড়িয়ে ধরলো।
তার মা এবার বললেন - 'যখন তুই বাইরে যাস তখন যে আমার মনের মধ্যে কী হয়, সেটা তোকে বলে বোঝাতে পারবো না। এমন একটা জায়গায় যাস যেটার বিষয় আমি কিছুই জানি না।'
'তুমি অনেক কিছুই জানো মা, না জানার তো কিছু নেই।'
'থাক, আর বেশি জেনে কাজ নেই আমার। তোর বাবাও সারাটা জীবন এসব করেই চলে গেল। এমন জায়গায় থাকিস যে এখানে কিছু হয়ে গেলে ছুটে আসতেও পারবি না।'
'এখানে তেমন কিছুই হবে না মা। মাসি, খাবার দাও, খিদে পেয়েছে। আমি স্নান করতে যাচ্ছি। স্নান করে এসেই খাবো।'
স্নান করার সময় হঠাৎ করেই একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল নীহারিকা। শাওয়ারের জল যখন তার গায়ে পড়ছে, তখন তার বন্ধ দু চোখে ভেসে যাচ্ছিল কিছু দৃশ্য। কিছু এমন দৃশ্য যেগুলো সে মনে করতে চায় না। কিন্ত মনে না করেও উপায় নেই। সেগুলো মনে পড়বে। একবার না, বারবার মনে পড়বে। একটা স্পেসক্রাফ্ট ছুটে চলেছে আশাকের দিকে। না, এটা নীল আকাশ নয়। না, এটা পৃথিবী নয়। এটা অন্য গ্রহ। তাহলে কি এটা টাইটান? স্পেসশিপটা আকাশের দিকে এমন পাগলের মত ছুটে চলেছে কেন? হঠাৎ করে নিজের চোখ দুটো খুললো নীহারিকা। তার হৃদয় গতি একটু বেড়েছে সেটা বলাই বাহুল্য।
একটু হলে ওই স্পেসশিপের সাথে কিছু এক ধাক্কা মারতো। না, আর বেশি চিন্তা করা যাবে না এটা নিয়ে। All's well that ends well, ইংরেজিতে একটা কথা আছে। এই কথাটাই এখানে প্রযোজ্য।
বাথরুম থেকে বেরোবার সময় নিজের মোবাইলের রিং শুনতে পেয়েছিল নীহারিকা। একবার না, দুবার। নীহারিকার ফোন কেউ রিসিভ করে না। তাই দুবার পুরো রিং হয়ে কেটে গেল। বাথরুম থেকে বেরিয়েই নীহারিকা নিজের মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলো, একটা মিস কল মিস্টার স্বর্ণাভ বিশ্বাসের এবং আরেকটা মিস কল সপ্তর্ষি মন্ডলের। সপ্তর্ষি তাদের স্পেসশিপ ভ্যালিয়েন্টের পাইলট। নীহারিকা থেকে বয়সে একটু বড়। সপ্তর্ষি কথা বলতে বেশ ভালোবাসে। শুধু ভালোইবাসে না, বরং কথা বলে বেশ সুন্দর। নিজের কথা দিয়ে সামনের লোককে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে সে।
নীহারিকা মোবাইলটা হাতে নিয়েছিল ঠিক তখনই আবার কল এলো সপ্তর্ষির।
'একটি খবর পেয়েছিস?' সপ্তর্ষি জিজ্ঞাসা করলো নীহারিকাকে।
'কী খবর?'
'তোকে মিস্টার বিশ্বাস কল করেনি?'
নীহারিকা বললো - 'হ্যাঁ করেছিল। কিন্তু আমি তখন বাথরুমে ছিলাম। কল রিসিভ করতে পারিনি।'
'আজ রাতে হোটেল রিভার ভিউতে আমাদের ডেকেছে, আমাদের সবাইকে।'
'কেন?'
'আমাদের এই সাকসেসফুল মিশনের জন্য চিফ একটা গ্র্যান্ড পার্টি রেখেছে। মিডিয়াও থাকবে সেখানে।'
********************************
হোটেল "রিভার ভিউ" কলকাতার হুগলী নদীর ধারে বানানো এক বিশাল হোটেল। হোটেলের বাইরে আজ অনেক দামি-দামি গাড়ির লাইন লেগে আছে। এখন প্রায় রাত আটটা। নিমন্ত্রিতরা এখনো একে-একে এসে যাচ্ছে। বেশ কিছু মিডিয়ার ও ভি ভ্যান দেখা যাচ্ছে হোটেলের পার্কিংএ। হোটেলের ভিতর এক বড় ব্যাংকোয়েট হলে লোকেদের বেশ ভালো ভিড়। হলের এক প্রান্তে বানানো আছে একটা স্টেজ। স্টেজে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। মিস্টার স্বর্ণাভ বিশ্বাস এবং ইসরোর ইস্ট্রান উইংয়ে চিফ মৃত্যুঞ্জয় ভৌমিক। মৃত্যুঞ্জয় ভৌমিকের হাতে এক মাইক।
'আজ আমাদের মিশন যে সাকসেস হয়েছে তার জন্য মিস্টার বিশ্বাসকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। আজ থেকে এক বছর আগে যখন আমি এই মিশনের জন্য মিস্টার বিশ্বাসকে গ্রীন সিগনাল দিই, তখনো আমার মনে কিন্তু-কিন্তু ভাব ছিল। তবে কোথাও না কোথাও মিস্টার বিশ্বাসের উপর আমার আস্থা ছিল। সেই আস্থার কারণেই আমি মিশনের গ্রীন সিগনাল দিয়েছিলাম। আমি এখানে আরো একজনের নাম নেবো, সে হলো ক্যাপ্টেন নীহারিকা গাঙ্গুলী। আমি তাকে রিকোয়েস্ট করবো এই স্টেজে আসার জন্য।'
হলের চারিদিক দিয়ে তালির আওয়াজ শোনা গেল। নীহারিকা স্টেজের কাছেই ছিল। এগিয়ে গেল স্টেজের দিকে। মিস্টার বিশ্বাস মৃত্যুঞ্জয় ভৌমিকের ডান দিকে দাঁড়িয়েছিলেন, নীহারিকা তার বাঁ দিকে এসে দাঁড়ালো। মিস্টার ভৌমিক আবার বললেন - 'অল্প বয়স হলেও নীহারিকার মধ্যে টিম লিড করার দক্ষতা প্রচুর। আমাদের স্পেসশিপ ভ্যালিয়েন্টের ক্যাপ্টেন যদি নীহারিকা না হতো, তাহলে হয়তো এই মিশনটা এত সহজে সফল হতো না। আপনার সবাই জানেন যে নীহারিকা এর আগে দুটো মিশন করেছে। একটা মুন মিশন এবং দ্বিতীয় মিশন মার্স। কিন্তু এই দুটো মিশনেই নীহারিকা ক্যাপ্টেন ছিল না। টাইটান মিশনে আমি বিশ্বাস দেখলাম নীহারিকার উপর। এটা বলাই বাহুল্য নীহারিকা আমার বিশ্বাসের মান রেখেছে। ক্রিউয়ের বাকি মেম্বারদেরো সমান ভাবে যোগদান আছে এই মিশানের সাফল্যের পিছনে। আমাদের দেশ একটা ইতিহাস গড়লো। আজকের এই পার্টি তাদের নামে, যাদের জন্য আমাদের দেশ এই ইতিহাস গড়তে সফল হয়েছে। থ্যাঙ্ক ইউ টু অল অফ ইউ। এনজয় দ্য পার্টি।'
পার্টি চলতে থাকলো নিজের মত। মিডিয়া মিশন টাইটান এর আ্যসট্রনটদের বাইট নিতে ব্যস্ত হয়ে গেল। ক্যাপটেন নীহারিকা গাঙ্গুলী, পাইলট সপ্তর্ষি মন্ডল, কো পাইলট অর্ণব সামন্ত, টেকনিশিয়ান অম্লান ঘোষাল এবং আ্যসিসটেন্ট টেকনিশিয়ান অরিজিৎ মিত্র, মিডিয়া চারিদিক দিয়ে ঘিরে রইল এদের বেশ অনেক্ষণ। মিস্টার ভৌমিক এবং মিস্টার বিশ্বাস বেশ কিছু বিজনেসম্যানদের সাথে কিছু আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
'নীহারিকা!' নীহারিকার পাশে এসে দাঁড়িয়ে তার কানে আস্তে করে বললো সপ্তর্ষি।
কিছু ম্যাগাজিনের ফ্রন্ট কাভারের জন্য তখন নীহারিকার ছবি নেওয়া হচ্ছিল।
'কী হলো?' ফটোগ্রাফারদের থামিয়ে নীহারিকা জিজ্ঞাসা করলো সপ্তর্ষিকে।
'কিছু কথা আছে। সাইডে আয়। অর্ণব, অম্লান, অরিজিৎ সবাই আছে।' কথা শেষ করে সপ্তর্ষি এগিয়ে গেল বাকি ক্রিউ মেম্বারদের দিকে। খানিক পর নীহারিকাও এলো। প্রত্যেকের হাতেই খাবার যুক্ত প্লেট।
'নীহারিকা, তোর কি মনে হয় না যে আমাদের চিফ আর মিস্টার বিশ্বাসকে সব কিছু পরিষ্কার করে বলা উচিত?' কথাটা বললো অর্ণব।
নীহারিকা সবার দিকে একবার ভালো করে তাকালো।
'বলা উচিত। কিন্তু এটা কি বলার সময়? ভাবছি কাল অফিস টাইমে বলবো।' নীহারিকা বললো।
'আসল তথ্যটা জানানো দরকার নীহারিকা। যতো দেরি হবে, ততো কিন্তু অনিষ্টের আশঙ্কা বেড়েই যাবে। এমনিতেও আমাদের ফিরে আসার তিন দিন হয়ে গেল।' বলল সপ্তর্ষি।
'তাহলে এখনই গিয়ে বলে দিই? সবার সামনে? তুই হয়তো ভুলে যাচ্ছিস সপ্তর্ষি যে এই হলে শুধুমাত্র ইসরোর লোক নেই, প্রচুর বাইরের লোক আছে এবং তার সঙ্গে মিডিয়ার ভিড়। তুই কি এটা চাস যে কথাটা ছড়িয়ে পড়ুক চারিদিকে? চারিদিকে চিফের বদনাম হোক? শুধু তিন দিন হয়নি সপ্তর্ষি, প্রায় ষাট দিন হয়ে গেছে ওই ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার। এতদিন যখন অপেক্ষা করা হয়ে গেছে, তখন আরো এক দিন অপেক্ষা করতে ক্ষতি কোথায়?'
নীহারিকার কথায় যুক্তি আছে। প্ৰত্যেকেই একে ওপরের দিকে তাকালো।
'চিন্তা করিস না তোরা। আমি চাই না যেটা আমাদের সাথে হয়েছে, সেটা ভবিষ্যতে আর কারোর সাথে হোক।' কথাটা বলে নীহারিকা সেখান থেকে চলে গেল।
********************************
রাত একটা হবে। নীহারিকার বাড়ি ফিরে আসার ঘন্টা খানেকের উপর হয়ে গেছে। বাড়িতে বাকি দুজন ঘুমিয়ে গেছেন। কিন্তু নীহারিকার চোখে ঘুম নেই। নিজের ঘরে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে বিছানায় বসলো। খাটের পাশের জানালাটা খোলা। বেশ সুন্দর হাওয়া আসছে জানালা দিয়ে। নীহারিকার মুখে অদ্ভুত ধরণের চিন্তা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। ল্যাপটপ অন করে সব থেকে আগে নীহারিকা সার্চ করলো "মিশন ইন্ডিয়ানা"। না, সার্চের পরিণাম খুব ভালো এলো না। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে ইসরোর ইস্টার্ন উইং থেকে টানটানে একটা ম্যান মিশন করা হয়েছিল। মিশনটার নাম ছিল, মিশন ইন্ডিয়ানা। মিশনের ক্যাপটেন ছিল দেবব্রত চৌধুরী। প্রায় তিন মাসের মিশন ছিল। তিন মাস পরে তারা ফিরে আসে। ইনটারনেটে এর থেকে বেশি তথ্য পাওয়া গেল না। নীহারিকা ইসরোর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে "মিশন ইন্ডিয়ানা" লিখে সার্চ করলো। কিন্তু এতেও তাকে হতাশ হতে হলো। সেখানে পরিষ্কার লেখা আছে, "দিস ফাইল ইস কোনফিডেন্সিয়াল"। অবশেষে ল্যাপটপ বন্ধ করার আগে সে ভাবলো আরো একবার সার্চ করে নেওয়া যাক। পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সার্চ করার পর শেষে একটা আর্টিক্যাল পেল নীহারিকা। আর্টিক্যালটা আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে লেখা। যিনি লিখেছেন তার নাম, সুব্রত বাগচী। নীহারিকা আর্টিক্যালটা ভালো করে পড়া শুরু করলো।
"আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে ইসরোর ওই প্রচেষ্টার প্রশংসা করতেই হয়। প্রশংসা করতে হয় ইসরোর ইস্ট্রান উইংএর চিফ মিস্টার কুণাল গোস্বামী মহাশয়কে। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত তিনি নিলেন, যার জন্য আমাদের দেশ আজ গর্বিত। কিন্তু কিছু প্রশ্ন এখনো মনে খটকা দেয়। কিছু এমন প্রশ্ন, যেগুলো উত্তর বিগত দশ বছরেও পাওয়া গেল না, আর ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে, সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। মিস্টার দেবব্রত চৌধুরীর নেতৃত্বে যে টিমকে টানটান নামের উপগ্রহে পাঠানো হলো, তাদের ফিরে আসার পর কোনো দিন মিডিয়ার সামনে আনা হলো না কেন? ওই মিশনের পরিণাম কী হলো, সেটাও কোনো দিন ইসরোর দিক থেকে জানানো হয়নি। কেন? মিশন কি সফল হয়নি? সফল নাই হতে পারে। সব মিশন যে সফল হবেই সেটার কোনো মানে নেই। কিন্তু এমন ভাবে মিশনের পরিণামকে সবার থেকে লুকিয়ে রাখার কারণটা কী? মিশন ইন্ডিয়ানার ক্রিউ মেম্বাররা এখন কোথায়? কোথায় ক্যাপ্টেন দেবব্রত চৌধুরী? দেবব্রত চৌধুরীর বাড়িতে বিগত দশ বছর ধরে তালা ঝুলছে। তাহলে কি এটা মেনে নেওয়া যেতে পারে যে দেবব্রত চৌধুরী মিসিং? মিশনের কিছু মাস পর চিফ কুণাল গোস্বামী নিজেও চাকরি থেকে ত্যাগপত্র দেন? কারণ অজানা। আদৌ কি এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে, নাকি এই প্রশ্ন গুলো শুধু প্রশ্নই থেকে যাবে।"
এর থেকে বেশি কিছু তথ্য পেলো না নীহারিকা। আরো কিছুক্ষণ খুঁজলো সে। কিন্তু খোঁজা বৃথা। কিছুই পাওয়া গেল না। নীহারিকা সময় দেখলো, রাত দুটো বাজে। এবার ঘুমানো দরকার। নিজের ল্যাপটপ বন্ধ করে শুয়ে পড়লো সে। মাথায় কিছু চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। একবার অফিসের আর্কাইভে যেতে পারলে কেমন হয়? যদি কিছু তথ্য পাওয়া যায় সেখান থেকে।
ক্রমশঃ....