ঝরাপাতা
পর্ব - ৭৭
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
রনির ঠাট্টা শুনেই পিউ খেয়াল করে মজা করতে করতে ও প্রায় বনির গায়ের উপর হেলান দিয়ে আছে। তড়াক করে সোজা হয়ে যায়। বনিও ওর হাত ছেড়ে দিয়েছে। পিউ চটপট সবাইকে খেতে দিতে ব্যস্ত হয়ে যায় লজ্জা ঢাকতে।
রনি দাদার পাশে চেয়ার টেনে বসে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসের নাম করে সবাইকে শুনিয়ে বলে, "কি রে, খুব ভাব চলছে? আজ তাহলে ছুটি নিয়ে ঘুরে আয়। নাকি ভ্যালেন্টাইন ডের প্ল্যান কমপ্লিট, তাই ম্যাডাম এত খুশি?"
বনি কটমট করে তাকায়। মণিকা চায়ের কাপে মুখ ডুবিয়ে মনে মনে বলে, "বেশি বাড়িস না রনি। একেই কাল রাতের সিনেমা মিস করে পিউ নির্ঘাত নতুন প্ল্যান আঁটছে। তার উপর তুই লেগেছিস ওরই পিছনে? কপালে কি নাচছে দেখ।"
পিউ হাসিমুখে খাবারের প্লেটটা রনির সামনে রাখতে রনি ফিসফিস করে, "আজ কোনদিকে যাওয়া হচ্ছে?"
পিউ ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করে, "এবেলা এই খেয়ে নিয়ে ইউনিভার্সিটির দিকে যা। ঘোল বানিয়ে রাখছি, খানিকটা খাওয়াবো, খানিকটা তোর মাথায় ঢালবো।"
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
সমর আর গোপা বাড়ির সবার সঙ্গে আলোচনায় খানিকটা বুঝেছিল, রনির সঙ্গে অশান্তিটা সাময়িক। আর গত দুদিন ধরে মিলি যখন ওবাড়িতে থেকেই গেছে, স্পষ্ট হয়ে গেল, রনিকে মেনে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে ভালোভাবে অনুষ্ঠান করে সবাইকে জানিয়ে ওবাড়িতে পাঠানোই ভালো।
তবে অনুষ্ঠানের জন্য নতুন করে কথা শুরু করতে হবে, আর তখন আবার লিলিকে নিয়েও সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। এভাবে বারবার মেয়ের বাবা মা হিসেবে ওদের উপরেই কথা বলার চাপটা আসছে, আর সেখানে রনি বা ওর পরিবারের মতটাই চলে কাজের বেলায়। এজন্য বেশ বিরক্ত লাগছিল ওদের।
তবুও একটা নিষ্পত্তি হয়েছে এই দুদিন, একরকম ভালোর দিকে বইছে এখন ভাবনা। কারণ পরদিন পিউ ফোন করে লিলি ফোন করে সব বলা থেকে রনি আর মিলির চোর ধরা অভিযান, সবটাই গোপার কানে ঢেলেছে।
দুজনের ভাইবোনদের আবার ডেকেছে ওরা। সবাই মুখোমুখি বসে পরামর্শ করে নেবে। তারপর মণিকার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে কথায় কথায় একটা সমাধান বের করতে হবে।
আগামী রবিবার সবাই আসবে। তার আগেই আজ মিলি দুমদাম করে ঢুকে "ও মা একটু এসো না" বলে হাঁক দিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা দেয়।
গোপা রান্নাঘরে, সমর গামছা কাঁধে স্নানে যাচ্ছিল। ঐভাবেই চেঁচায়, "এ্যাই মিলি, দাঁড়া দাঁড়া। ওবাড়ি থেকে এলি? দিদি কেমন আছে?"
- "ভালোই আছে। কাল একবার চেকআপ হবে। মুশকিল হল, আমাকে কিছুতেই আসতে দিচ্ছে না। আজ বললাম, এখন তো ঠিক আছ, আমি বিকেলে দেখা করে যাব। সামনের সপ্তাহে কলেজ খুলবে, এখানে চলে আসি। তা হবে না। আমার হাত ধরে রেখে দিল। পিউবৌদিকে পটিয়ে, জামাকাপড় নেব বলে এসেছি।" মিলি আবার হাঁটা দেয়। রনিও স্নানে ঢুকেছে। ইউনিভার্সিটি বেরনোর আগে ওকে থাকতে হবে মেসেজ করেছে। এর মধ্যে দু চারটে কুর্তা নিয়েই ও দৌড়বে ভেবে এসেছে।
- "বেশ করেছিস, চলে এসেছিস।" আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এসে দাঁড়িয়ে গোপা শুনছিল। এবার বলে, "আমি চিন্তায় অস্থির হচ্ছি, ঐ অসুখের বাড়িতে তোর খাওয়া ঘুম কি হচ্ছে। চলে যখন এসেছিস, ফোন করে দিচ্ছি, একদম কাল যাবি। অঙ্কুরদের বাড়ি ঘুরে আসি চল বাবা বেরোলে। প্রতিবার পরীক্ষার পর দু পাঁচদিন গিয়ে থাকিস, তোর কাকিমনি দুঃখ করছিল। আজ যাই চল।"
মিলির মুখটা ততক্ষণে শুকিয়ে গেছে। তাহলে রনি বেরোনোর আগে ফেরার কি হবে?
গোপাও মন দিয়ে মেয়ের মুখচোখের পরিবর্তন দেখছে। হঠাৎ মুখ শুকিয়ে যাওয়া দেখে অনেক কষ্টে হাসি চেপে আছে।
মিলি বলে, "ও বাবা, কাকিমা ছাড়বে না। আর আমি না গেলে যদি শরীর খারাপ হয়?"
- "হবে না দেখিস। আমি বুঝিয়ে বলব আর তুই একেবারে আর যাবি না, এমন কথা বলছি নাকি? বেশ, আমি বলে দিচ্ছি যে তুই ওবেলা যাবি।" গোপা চলে যায় নিজের ফোন নিতে।
মিলি কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে ব্যাজার মুখে ঘরে ঢোকে। কয়েকটা জামা গুছিয়ে নিতে না নিতে জ্বলজ্বলে মুখে মা হাজির, "কথা হয়ে গেছে। তুই রাতে যাবি, দিদির সঙ্গে থাকবি। এখন চল, বাবার সঙ্গে বসে কিছু খেয়ে নে, একসঙ্গে তিনজনেই বেরোই।"
তার খানিক পরেই রনির মেসেজ আসে, "কখন ফিরবে?''
মিলি উত্তরে জানায়, কাকুর বাড়িতে যেতে হবে এখন। আশাহত রনি ইউনিভার্সিটি রওনা হয়।
কাকুর বাড়িতে গিয়ে অবশ্য মিলি কাকিমনি আর অঙ্কুরের সঙ্গে গল্পে তখনকার মতো হাসিখুশি হয়ে ওঠে। দু ভাইবোনকে গল্প করতে ছেড়ে গোপারা দুই জা মিলির পরিস্থিতি নিয়ে হাসাহাসি করে কাটায়।
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
সন্ধেয় গুটিগুটি মিলি ফিরে এলো রনির বাড়িতে। পিউ আর মণিকার প্ল্যান রেডি ততক্ষণে। ঘড়ির কাঁটায় রনির ফেরার সময় ঘনিয়ে আসছে দেখে নিয়ে পিউ বলল, "মিলি, লক্ষ্মী মেয়ে একটা কাজ করে দে তো। ভাইয়ের ঘরে ওর পড়ার টেবিলে টুকাই ছবি এঁকেছিল দুপুরে। একটু মুছে রাখ না। আমি তখন ভুলে গেছি। এখন মোমো বানাতে বসেছি, হাত জোড়া।"
চলবে