Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

পরাণ বঁধুয়া - 3

পরাণ বঁধুয়া

পর্ব - ৩

শর্মি বলে, এখন রুমু ফিরে এসেছে বাড়িতে। বাবলি ওষুধ খেয়ে শুয়েছে। তাই ও ছুটে এসেছে এখানে। উজাড় করে বলতে থাকে, সেই ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত কত কথা। স্বপনবাবু তো বটেই, বৌরাও অনেক গল্প জানে। সকলের দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারি হয়ে যায়। ছেলে মেয়েরা বাড়ি ছিল না। তাই কথাটা এদের মধ্যেই থেকে গেল। 

সন্ধ্যায় দাদাবৌদির সঙ্গে রুমুকে নিয়ে বাবলি এল দেখা করতে। বাড়ির বড়দের সমস্ত বাৎসল্য গিয়ে পড়ল ভাগ্যতাড়িত মেয়েটির উপর। আদর যত্নের অবধি রইল না। এত আদর কেন ওর প্রতি, সত্যি না জানলেও রুমুরও অবাক লাগল না। মামা মামীর রাজকন্যা রুমু ধরে নিয়েছে মামীর বাপের বাড়িতে এত বছরে ওর জন্য জমে থাকা আদর একদিনে ওর কোলে এসে পড়েছে। ওদিকে কিছু না জেনে মৌ, তুলি আর মিলি বিয়ের কেনাকাটা দেখাতে ব্যস্ত রুমুকে। 

ওরা ওপরে চলে যায়। হঠাৎ সম্বন্ধ এসে তুলির বিয়ে, শ্বশুর বাড়ি, এসব নিয়ে খাপছাড়া আলোচনা হয়। বাবলির সামনে কি বলবে না বলবে, কেউ ভেবেই পাচ্ছে না। বাবলু কিছু জানে না বোঝা যায়। সে উৎসাহ ভরে বড় শ্যালকের ছেলেদের সঙ্গে আলাপ করায়। বড় মনীশ, যার ডাকনাম পুপুল, ব্যাঙ্কের অফিসার। হাসিখুশি, প্রাণবন্ত, সহজ ছেলে। দেখলেই ভাল লাগে। আর ছোট ছেলে অনীশ, ডাক নাম বুবুন, কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট। বড় বড় চোখ, শান্ত, গম্ভীর মুখে মেধার ঝলক। 

বাবলি বোঝে, পুপুল অনেকটা কাকাদের ধাঁচ, হাসিখুশি, ফুর্তিবাজ, নরম মনের। বুবুন যেন অধ্যাপক বাবার আদল বসানো, জ্ঞানীই শুধু নয়, দৃঢ়চেতা। বাবলির ছোটবেলার কথা মনে পড়ে এই দুই ভাইকে দেখে। এ বাড়িতে এসে কত খেলেছে, থেকেছে, কাকিমার কাছে শর্মির সমান আদর পেয়েছে। নিজের দাদার সঙ্গে সঙ্গে এই তিন দাদাও ওর বেড়ে ওঠার গল্পে জড়িয়ে আছে। তাই তো এতোদিন মাথা নিচু করে এ পাড়ায় আসতে পারেনি। আর আজ খবরটা পেয়ে ও চলে এসেছে নিজের বৃত্তে। মানসম্মান সরিয়ে নিজের ছোটবেলার বাবলি আর শর্মির বন্ধুত্বের কাছে। 

পরদিন মুখার্জি বাড়ির মেয়েরা পারিবারিক আড্ডায় কথা প্রসঙ্গে বলেছিল, রুমু কি সুন্দর দেখতে, কি স্মার্ট, অথচ মিশুকে। আর ওরই সঙ্গে কি খারাপটাই না হয়েছে অত ছোটবেলায়। 

মায়েরা বলে, আরও খারাপ হতে যাচ্ছে। মৌ, তুলি, মিলি, সবাই ওর মায়ের অসুখের কথায় আরও ভেঙে পড়ে, আরও মায়া ঘিরে ধরে মেয়েটার জন্য। মৌয়ের কাছে পুপুল বাবলির অসুখের কথা শোনে। তীর্থকে আজ ফোনে শুধু রুমু আর বাবলির কথাই বলে তুলি। 

সবার মনে একটাই চিন্তা, যদি রুমুর জন্য কিছু করা যেত। মামা মামীর প্রাণ ও। নিঃসন্তান মামা মামীর সংসারে ওর ভাগীদারও কোনোদিন আসবে না। তবুও বঞ্চনাটা তো কম হয়ে যায় না? 

🍁
🍁
🍁
🍁
🍁

আরও দুদিন এবাড়ি ওবাড়ি যাতায়াত চলছে। মৌ তো স্কুলে যায়ই। তার পরও গল্প চলছে রুমুর সঙ্গে, সেও ছাড়তেই চায়না বৌমণিকে। তুলি আর মিলিও ওখানে। বাবলু ফিরলে এমনিতেই মোহন এবাড়িতে প্রায়ই আসে। এখন সঙ্গে মোহনের স্ত্রী অহনা আর পুপুলও। 

তৃতীয় দিন সকালের দিকে শর্মি বড়দাকে ফোন করে বলেছে, আজ স্কুলের পর ওরা সবাই যাবে। একটু দরকার আছে। বাবলুও তাই তাড়াতাড়ি ফিরছে। সেইমতো সবাই বিকেলের চায়ের আসরে দেখা দেয়। 

তুলি আর মিলি গেছে রুমুকে নিয়ে সিনেমায়। কালই টিকিট কেটে বলে রেখেছে তীর্থ, একটা কমেডি মুভি এসেছে, রুমুকে দেখাতে নিয়ে যাবে ও। পুপুল, মোহন আর তপনবাবু তখনও অফিসে। 

চায়ের আসরে গুছিয়ে বসে বাবলু বলে, "বড়দা, তোমরা সব কথা আগেই শুনেছ। আমাকে এরা দু বন্ধু পরশু রাত অবধি লুকিয়ে রেখেছিল।"

কথা থামিয়ে স্বপনবাবু বলেন, "এত গুরুগম্ভীর ভাবে সবটা দেখছিস কেন তোরা? বরং তুই ছুটি করার চেষ্টা কর। শর্মি রুমুকে নিয়ে এখানে থাক। নাহয় শর্মিও যাক, রুমু দিব্যি আমার কাছে থাকবে। বাড়ির মেয়েরা, আমাদের মৌয়ের সঙ্গেই তো রয়েছে এই কদিন। তোরা মুম্বাই যা, চিকিৎসার দিকে মন দে। আগেই বাবলিকে দুর্বল করে দিচ্ছিস।"

--"চিকিৎসার ব্যবস্থার কথাটা তুমি একদম ঠিক বলেছ। তোমার বোনের কাছে পরশু রাতে প্রথম শুনে দিশেহারা হয়ে গেছিলাম। অস্বীকার করব না আমার সব আলো নিভে গেছিল। একটাই বোন। তাকে ওরকম বিয়ে আমিই দিয়েছি।" 

এখানে বাবলি ধমকে ওঠে, "আহ দাদা। ঐসব কাসুন্দি ছাড়। এতবছর তো হল। এখন যা বলতে এসেছি সেটা বল।"

--"হ্যাঁ, সেটাই বলছি। আমিও তোমার মতো করেই ভাবছি এখন বড়দা। আবার যদি লড়াইয়ের ময়দানে নামতে হয় নামব। মৌ স্কুলের দেখভাল করতে পারবে। শর্মি আর আমি দুজনেই যাব বাবলির সঙ্গে। তুমি আমাদের মনের কথাটাই বলে ফেলেছ প্রায়। রুমুকে তোমার কাছে দিয়ে যেতে চায় বাবলি। গতকাল একথা ভেবেছে ও। আমাদেরও মনে হয়, এর চেয়ে ভাল কিছু হতে পারে না রুমুর জন্য।" বাবলু হাতজোড় করে ফেলে। 

চলবে