Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

পরাণ বঁধুয়া - 6

পর্ব - ৬

একটু পরেই চার ভাইবোন এসে যায়। রাতের জন্য রান্না সেরে তৈরি বৌরা। তুলি, মিলি ঢুকে ধপধপ করে সোফায় পড়ে, ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত। পুপুলও এলিয়ে বসতে যাচ্ছিল, আরেক রাউন্ড চায়ের আশায়। ওখান থেকে বুবুনের তাড়ায় চলে আসতে হয়েছে। বাবার গলায় সোজা হয়ে বসে। 

--"বুবুন, একটু এখানে বোস। তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।"

বুবুন দাঁড়িয়ে পড়েছে, "বলো বাবা, শুনছি। আমি একটু কাজ নিয়ে বসব।"

--"তাও এখানে বোস। মিলি, পিছনের চেয়ারে যা। বুবুন, আমার সামনে বোস। দেখ, আজ তোর মামনি, পিসো আর বাবলিপিসি এসেছিল। ওদের সবার ইচ্ছে, তোর সঙ্গে রুমুর বিয়ে দেয়। বাড়ির সবাইকে আমি জিজ্ঞেস করেছি। আমাদের সবারও ইচ্ছে। এখন তুই বল।"

--"আমি বলব মানে? আমার যা বলার তো বলেছি। এখন আমি বিয়ে করব না।"

--"সে তো তখন বলেছিস। মেয়ে দেখা, লোকের বাড়ি গিয়ে মিষ্টি খাওয়া, কি রেস্টুরেন্টে অচেনা কোনো মেয়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাকে বাজিয়ে দেখা তোদের রুচিতে বাধবে আমি জানি। পুপুলও তো বলেছিল, ওসব পারবে না। পারা উচিতও না। আমি একমত। আমরা বড়রা দেখতে যেতাম, তাই নিজেদের কি ছোট লাগত। এখন অন্য কথা বুবুন।" স্বপনবাবু খুব সাবধানে কথা এগোন। 

--"অন্য কি কথা বাবা? আমার কাজটা নিয়ে আমি পাগল হয়ে আছি। ভেবে দেখো না, তোমার আমাকে ঠেলে ঠেলে তুলিদের আনতে পাঠাতে হচ্ছে, এখানে তোমাদের সঙ্গে দু মিনিট বসার জন্য আলাদা করে বলতে হচ্ছে। আমার অবস্থাটা কি তাহলে? কি রে রাঙাদা, তোকে তো আমার কাজের কথাই বলছিলাম তখন?" বুবুন তাড়াতাড়ি দাদাকে সাক্ষী মানে। 

--"তা তো বলেছিস। এখন ঐ ইয়ে আরকি, বাবা কি বলছে শোন। আর বিশেষ করে রুমুর মতো মেয়ে, এটা ভাব।" পুপুল ভাইয়ের পাশে না, বাবার পাশেই দাঁড়ায়। কারণ মিষ্টি মেয়েটার বাবা, মা, দুদিক থেকেই আঘাত অন্যদের মতো পুপুলও যে মানতে পারেনি।

এদিকে রাগে বুবুনের ব্রহ্মতালু জ্বলে যায়। রুমুর মতো মেয়ে মানে? ঐ তো এই টুকুনি একটা মেয়ে। বুবুনের সাত আট বছরের ছোট। যখন এখানে আসত, তুলি মিলির সঙ্গে রান্নাবাটি খেলত আর ঝগড়া হলেই কান্না। এই দুদিন বুবুন দেখেছে, বেশ লম্বা হয়েছে, দেখতে শুনতে ভালই হবে। কিন্তু প্রথমদিন এল একজোড়া থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর পেটের সামনে গিট্টু বাঁধা একটা হাতা গোটানো সাদা শার্ট পরে। আজ গিয়ে দেখে, শর্টস পরে আড্ডা দিচ্ছে। ওরা এত বড় বড় দুটো ছেলে গেল, চেঞ্জ করে আসতে পারত তো ! ঐ বোম্বাই চালের মেয়েকে বিয়ে করতে হবে? হঠাৎ বুবুনের একটা সন্দেহ হয়, ওকে কি ইচ্ছে করে ও বাড়ি পাঠানো হয়েছিল এখন? রুমু আর বাবলিপিসি জানত ও যাচ্ছে? চোয়াল শক্ত হয়ে যায় বুবুনের। ওরা জানে না, বুবুন অত সস্তা ছেলে না। 

শক্ত মুখে বলে, "রুমুর মতো মেয়েকে বিয়েতেও আমার আপত্তি আছে। রুমুর জীবন ঠিক আমাদের পরিবারের মতো নয় বলেই আমার ধারণা। তোমরা সবাই আমার বড়। সবাই যখন এতে রাজি, আর সেই আলোচনায় আমি ছিলাম না, আমি ধরে নিচ্ছি, তোমরা ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছ। তবুও বলব, তোমরা স্নেহের বশে এটাতে মত দিচ্ছ কিনা আবার ভেবে দেখ। আজকালকার দিনে ভাই ভাই একজায়গায় থাকা যথেষ্ট দুর্লভ বলা যায়। সেখানে আমরা পুরনো দিনের মতো করেই আছি। রুমু এই যৌথ পরিবারের উপযুক্ত কি? সামনে তুলির বিয়ে। নতুন কুটুম হচ্ছে আমাদের। কদিন পর মিলির বিয়ে হবে। কোনো সাংসারিক অশান্তি হলে, সংসার ভাঙলে নতুন আত্মীয়দের সামনে মানসন্মান আর থাকবে না। যাইহোক, আমার যা মনে হল বললাম। এবার তোমরা ভাব।"

পুরো ঘর নিস্তব্ধ। বুবুন আপত্তি করবে, তা না না না করবে। চেপে ধরে সবার ইচ্ছে বললে, রাজিও হবে, এটাই মাথায় ছিল। এদিকে বুবুন, মুম্বাইতে বড় হওয়া রুমুর অতি আধুনিক চালচলন, পাঁচজনের সংসারে কেমন লাগবে বোঝাতে গেছিল। বাড়ির ছোট থেকে বড় সবার সামনে একটি মেয়ের পোশাক আশাক নিয়ে ইঙ্গিত করতে পারেনি। যদিও তাতেই আরও সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে যায়। সকলের মনে হয়, রুমুর বাবার কান্ডের জন্য, ভাঙা পরিবারের মেয়ে রুমুকে বুবুনের পছন্দ নয়। সেক্ষেত্রে আর আশাও নেই বোঝানোর। 

বুবুনের বিয়ে, বুবুনের পছন্দ, অপছন্দ, মতামত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। ওর একটা দুটো স্পেশাল পছন্দ, অপছন্দ না মেনে পাত্রী ঠিক করাও অন্যায় হবে। এ বাড়িতে যত বিয়ে হয়েছে, কারো শ্বশুর বাড়ির পরিবারে এরকম দাগ নেই। বাবলুর বাবা মায়ের দিকে তো কথাই ওঠে না। যার সঙ্গে হয়েছে, সেই বাবলিরও কোনো দোষ নেই। বাবলির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে ওরা সবাই দেবদত্তের উপর ক্ষিপ্ত। এখন দেবদত্তের রক্ত গায়ে আছে বলে বুবুন যদি রুমুকে অবিশ্বাস করে, কে কি বলবে ওকে? 

চলবে