পর্ব - ৮
বাপরে বাপ, সেদিন থেকে, নাক মলেছে, কান মলেছে বুবুন। কান্না কাকে বলে? বুবুন দূরে থাক, বাড়ির কেউ থামাতে পারে না! বাকিরা আচ্ছাসে ওকে ঝাড়ও দিচ্ছিল, ও কি করেছে না জেনেই।
রাঙাদাই বরং জিজ্ঞাসা করেছিল, হয়েছেটা কি? আমতা আমতা করে ও বলতেই এবার হাসির ধুম।
মা বলল, "নিজের ভাইবোন যখন না, আমরা চললাম। পরের ভাইবোন নিজেরা মেটাক।"
ও কান ধরে বৌমণির সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, "আর করব না, সত্যি বলছি। আর কি শাস্তি পাওনা বলো?"
এমন বৌমণির সামনে সারাজীবন কান ধরে দাঁড়াতে রাজি আছে। এখনও কাজের চাপে যদি বা বলেও ফেলে, "আমি বাচ্চা ছেলে না। তোমার বসে থাকতে হবে না।" বৌমণি পেটেন্ট ডায়লগ শুরু করলেই ওরও ডায়লগ ধরা আছে, সাপ্লাই করেছে অবশ্য ছোটকা, বৌমণি চলে গেলে ও খাবে না। দারুণ কাজে দেয়। হবে না? এই বলেই তো মেজকা আর ছোটকা নাকি কমবয়েসে ওর মা, মানে নিজেদের বড় বৌদিকে জব্দ করত।
আজ মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় বুবুনের। বাড়ির সবার সঙ্গে ওর সম্পূর্ণ অকারণে একটা দূরত্ব তৈরি হল। অকারণও নয়, বাইরের একটা মেয়ের জন্য। নিজের ঘরে টেবিলে ল্যাপটপ আর একগাদা প্রিন্ট আউট ছড়িয়ে কাজ নিয়ে বসেছিল বটে, মন বসছে না। এদিকে কাজটাও ভীষণ দরকারী। বুবুনের নিজের কাজ নিয়ে, পড়াশোনা নিয়ে ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ববোধের অভাব নেই। তবে সে ব্যাপারে বাড়ির লোকেরাও সবসময়ই পাশে ছিল। তেমনি ওর নিজেরও একটা দায়িত্ব আছে বাড়ির প্রতি। এখন যে কাজটা করছে, সেটার প্রস্তাব আসার পর বহু ভেবেছে। বাবার সঙ্গে পরামর্শও করেছে। বাবা এককালে বেশ গোঁড়া ছিল, ও কিছু কিছু গল্প শুনেছে। অথচ ওর নিজের কখনো সেটা মনে হয়নি। খুব সম্ভব সময়ের সঙ্গে বাবা ঠাকুমা ঠাকুর্দার আমলের পুরনো ধ্যান ধারণার কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে। সেটা মামনির ঘটনার জন্য হওয়াই সম্ভব। তবে বাবার বিচক্ষণতার উপর খুব আস্থা আছে বুবুনের। একা বুবুন কেন, বাড়ির সবার।
এই প্রোজেক্টের ব্যাপারে যেমন বাবা যেটুকু শুনেছে ওর মুখে, প্রথমেই বলেছিল, "কাজটার জন্য শুধু মেধা নয়, আরও অনেক কিছু প্রয়োজন, এটা যখন তুই বুঝতে পেরেছিস, ফার্স্ট লেভেল তো উতরেই গেছিস। এখন সেভাবে নিজেকে তৈরি কর। দুই বা তিন বছর সময় লাগবে। নে সেটা। কোনোদিন যেন কাজটা যেতে দিয়েছিস বলে আপশোষ করিস না। আবার হাফ হার্টেডলি কোনো কাজ কর, তুমুল আগ্রহ বোধ না করলেও, টাকা বা খ্যাতির জন্য কাজটাতে যুক্ত হ, এটাও করে বসিস না।" যখন সুতপা কাজ ছেড়ে গেল, বাবার কথার মানে বুঝল ও।
এখনও একটা কেমন আনক্যানি ফিলিং হচ্ছে ওর। বাবা কেন ওর মনোভাব জেনেও এই প্রস্তাব পছন্দ করল? নিজের প্রাইমারি রিএ্যাকশন নিয়েও ভেবেছে। এখন বিয়ে করবে না, করতে পারবে না, এটাতে স্টিক করে থাকার মধ্যে কোনো ভুল নেই। ও বলে কোয়ে এই দায়িত্ব নিয়েছে। এখন বাড়িতে এসব কথা উঠলেই তো হবে না। হ্যাঁ, ওদের হয়তো রুমুকে খুব পছন্দ হয়েছে। তাই বুবুন মত বদলাবে এক্সপেক্ট করছিল।
ঐখানেই খটকা লাগছে। বুবুনের মোটেই রুমুকে বিয়ের কথা মাথায় আসেনি, শোনার পরও ভাল লাগেনি। এদের এত ভাল লাগল যে সারা বাড়ি ভেঙে পড়ল? ঘড়ি দেখল ও, সাড়ে ন টা বেজে গেছে। একফোঁটাও কাজ হয়নি। সেটাই স্বাভাবিক। বাড়ির সবাই ওর উপর অসন্তুষ্ট, আর ওর মানসিক শান্তি বজায় থাকবে, এ হতেই পারে না। সবাইকে বোঝাতেই হবে। তাছাড়া বসে থেকে কি লাভ? কাজই হচ্ছে না যখন?
বুবুন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ছোটকার ঘরে আড্ডা হচ্ছে। বিনবিন কথার আওয়াজ। রাঙাদারা নিশ্চয়ই ওখানে। বাবার ঘরের দিকেও উঁকি দেয়। বাবা চুপ করে শুয়ে গান শুনছে, শ্যামাসংগীত। মন ভাল নেই এখান থেকেই মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে। বাকিরা তার মানে মেজকার ঘরে।
বুবুন ছোটকার ঘরে মুখ বাড়ায়, "তোমরা সবাই এখানে?"
একটু কি চমকে উঠল সবাই? ছোটকা সামলে নিয়ে বলল, "হ্যাঁ ঐ গল্পগুজব। তুই ব্যস্ত মানুষ। তাই আর বলিনি। অবশ্য তেমন কিছু না।"
বুবুন ঢুকতে পা বাড়িয়েছে, বিশ্বাসঘাতক বৌমণি বলে, "আমি একটু কথা বলছিলাম, সরি গো। একবার কফি দেওয়া উচিত ছিল। তোমাকে কাজ ফেলে উঠে আসতে হল। এক্ষুণি দিচ্ছি।"
ছোটকার খাটের উপর বিভিন্ন দিকে গড়াচ্ছিল তুলি, মিলি আর বৌমণি। ছোটকা আর রাঙাদা পাশে দুটো বেতের চেয়ারে বসে ছিল। ওকে দেখেই বৌমণি উঠে বসেছে, এখন খাট থেকে নেমেও যাচ্ছে।
--"আরে দাঁড়াও দাঁড়াও। আমি এখন কফি খাব না। তুমি বোসো। আমি গল্প করতেই এলাম।" বুবুন নিজেও এসে আর একটা চেয়ারে বসতে বসতে বলে।
চলবে