Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

প্রাইভেট আই সোসাইটি - 9


নমস্কার। আমি শিবনাথ ব্যানার্জী। আপনারা আমাকে চেনেন, কারণ এতক্ষণ ধরে আপনারা জানলেন কীভাবে আমি আর আমার ওই তারছেঁড়া বন্ধুটা মিলে এক মারাত্মক উটকো মরণফাঁদে জড়িয়ে পড়েছি। এখন যা বলছি, তা একদম প্রেজেন্ট টাইমের কথা।

আর আমি এখন নিজের ঘরের বিছানায় একটা আধ-মরা আলুর বস্তার মতো আছাড় খেয়ে পড়ে আছি। মুখ দিয়ে একনাগাড়ে একটা ভয়ার্ত ‘গো-গো’ শব্দ বেরোচ্ছে আর মনে হচ্ছে চারপাশের চেনা পৃথিবীটা কেমন যেন তাসের ঘরের মতো চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ভাবি, ওই যে ‘ফ্ল্যাট আর্থার্স’ সোসাইটির লোকেরা যারা দাবি করে পৃথিবী নাকি গোল নয়, চ্যাপ্টা—তারাই বোধহয় শেষ পর্যন্ত ঠিক ছিল জানেন তো! পৃথিবীটা সত্যি বোধহয় একটা থালার মতো চ্যাপ্টা, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমার অন্তত সেটাই মনে হচ্ছে।

হুম... নিজের ভবিতব্যের কথা ভাবছি, এমন সময় হঠাৎ—

ক্র্যাঁং! ক্র্যাঁং! ক্র্যাঁং!

একটা বিকট, কর্কশ শব্দে আমি বিছানা থেকে প্রায় তিন ফুট ছিটকে উঠলাম! ফোন বাজছে! কিন্তু এটা তো আমার মোবাইল নয়, ড্রেসিং টেবিলের কোণে ধুলো মেখে পড়ে থাকা আমার সেই পুরনো ল্যান্ডলাইন টেলিফোনটা!

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই তো! ওটাই বাজছে!

কিন্তু এই মরার সময়ে ল্যান্ডলাইনে কে ফোন করছে? সেই ভিলেন অর্গানাইজেশনটা? নইলে আর কার এত খেয়েদেয়ে কাজ থাকবে ভাই? তবে... তবে কি অন্য কিছু হতে পারে? যদি এমন কোনো সিক্রেট এজেন্ট হয়, যারা এই কুখ্যাত আন্ডারগ্রাউন্ড অর্গানাইজেশনটার বিরুদ্ধে গোপনে লড়াই করছে? হয়তো ফোনটা তুললেই ওপার থেকে কোনো গম্ভীর, ভরসাযোগ্য সাহেবি গলা বলে উঠবে— “আপনার কোনো ভয় নেই মিস্টার ব্যানার্জী! উই উইল সেভ ইউ ফ্রম দা—”

রিসিভারটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল— “ফোন এসেছিল?”

আরে ধুর ঢ্যাঁড়শ! এ তো সুবীর! এই মাঝরাতে ল্যান্ডলাইনে ফোন করে জ্ঞান দিচ্ছে!

আমি খিঁচিয়ে উঠলাম, “আরে ধুর শালা! তুই ল্যান্ডলাইনে ফোন করছিস কেন ভাই? এমনিতেই বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে, তুই ওদিকে ঘন্টা বাজিয়ে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলি পুরো! বাপরে বাপ!”

সুবীর ওপাশ থেকে একদম শান্ত গলায় বলল, “যদি ওরা আমাদের মোবাইল কল ট্র্যাক করে রেকর্ড করে? ল্যান্ডলাইনটা অ্যানালগ, পুরোপুরি সেফ না হলেও হট করে কারুর মাথায় আসবে না যে আমরা এটা ইউজ করছি। ক্রাইম সাইকোলজি বলে, খুনিরা সবসময় মডার্ন টেকনোলজির ওপর নজর রাখে।”

অকাট্য যুক্তি। হ্যাঁ, এটা ও মন্দ বলেনি। কিন্তু আমার মগজে তখন আর কোনো যুক্তি ঢোকার মতো অবস্থা ছিল না। আমি আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলাম না, প্রায় কেঁদেই ফেললাম, “ওরে ভাই সুবীর, আমরা এবার নির্ঘাত মারা যাব রে! আমাদের মুণ্ডু কেটে নিয়ে ওরা ফুটবল খেলবে! কী মরতে তোর ওইসব ম্যাপ আর টুনি লাইটের থিওরি নিয়ে অনলাইনে পোস্ট করতে গেলাম বল তো? এখন কী হবে?”

“থাম!” সুবীর ওপাশ থেকে ধমকে উঠল, “ঢের কাঁদুনি গেয়েছিস। এখন কান্নাকাটি করে লাভ নেই, আগে বাঁচার রাস্তা খুঁজতে হবে।”

আমি তোতোলা হয়ে বললাম, “ই-ইয়ে ব-ব-বলছি যে মানে... চল না ভাই? আমরা কলকাতা ছেড়ে অন্য কোনো দেশে গিয়ে চুপচাপ গা-ঢাকা দিয়ে থাকি? একটা ছোটখাটো দ্বীপ দেখে লুকিয়ে পড়লে ওরা আর খুঁজে পাবে না। হবে না?”

“উঁহু।” সুবীরের এক লাইনের উত্তর।

“না?” আমার গলাটা আরও একটু বসে গেল।

“একদমই না,” সুবীর বোঝানোর সুরে বলল, “প্রথমত, আমরা যদি নিজেদের আসল পাসপোর্টে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করি, ওরা এয়ারপোর্টের সার্ভার থেকেই আমাদের ইজিলি ট্র্যাক করে ফেলবে। আর যদি ফেক পাসপোর্টে দালালের হাত ধরে পালাতে যাই, তবে ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট আমাদের পিঠের ছাল তুলে নেবে। তাছাড়া বিদেশের মাটিতে এখন রেসিজমের যা অবস্থা, প্লেন থেকে নামতে না নামতেই হয়তো দেখব পাঁচটা মুস্কো লোক মেশিনগান বাগিয়ে আমাদের দিকেই তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”

সুবীরের কথায় আমার ভেতরের শেষ আশার বেলুনটাও একটা সস্তা আলপিনের খোঁচায় ফুস করে চুপসে গেল। আমি দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ফাঁকা গলায় বললাম, “...তা হলে আমরা এখন কী করব?”

“ওদের ধরতে হবে,” সুবীর চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “নইলে আমাদের বাঁচার আর কোনো আশা নেই।”

কথাটা শুনে আমার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। আমি খাটের কোণায় প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম একটু। কোনোমতে সামলে নিয়ে চেঁচালাম, “ধরব মানে? কাদের ধরব? ওই পোলাদের ? যারা ভরা বাজারে বন্দুক চালালেও ফরেন্সিক রিপোর্টে বুলেটের দাগ ওঠে না? যারা পাড়ার মাসির ল্যান্ডলাইন নম্বর চোখের পলকে হ্যাক করতে পারে? যারা ঘরে বসে অ্যাসাসিন পাঠায়? তুই পাগল হয়েছিস সুবীর?”

সুবীর ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। শুধু একটা ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেল। তারপর বলল, “...তোর ভয় পাওয়াটা আমি বুঝতে পারছি শিবু, কিন্তু... দ্যাখ, আমি বলছি যে আমরা যদি একটু ছদ্মবেশ নিয়ে—”

“সুবীর!” আমি আর শুনতে চাইলাম না।

“আরে ধুর ঘোড়ার ডিম ছাতা! কিছু একটা তো করতেই হবে ভাই, নইলে এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে দশ দিন পর আমরা দুজনেই বেঘোরে মারা পড়ব, বুঝছিস না কেন?”

এই লোকটা খাঁটি সাইকোপ্যাথ, সত্যিই! এই চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়েও ওর মাথায় ছদ্মবেশ আর কাউন্টার-অ্যাটাকের ভূত নাচছে। আমি এখন কাঁদব, না সুবীরের ওপর হাসব, নাকি রেগে গিয়ে নিজের মাথার চুল ছিঁড়ব—কিছুই বুঝতে পারলাম না। শুধু অনুভব করলাম, আমার চোখের সামনে চারপাশটা কীরকম যেন ঝাপসা আর অন্ধকার হয়ে আসছে।

স্পিকার থেকে সুবীরের গলাটা দূর থেকে ভেসে আসছিল, “শিবু? হ্যালো? লাইনটা কাটিস না, দাঁড়া ভাই একটু—”

আমি আর কোনো কথা না শুনেই রিসিভারটা সজোরে আছাড় মেরে হোল্ডারের ওপর রেখে দিলাম। আমার মাথাটা সত্যি সত্যিই ঘুরছে। নিজের পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে। আমি প্রায় টলতে টলতে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম, আর চোখ দুটো বোজার সাথে সাথেই এক অতল, কালচে ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

-- ৯ দিন বাকি --