“ক্রিং ক্রিং ক্রিং!”
অ্যালার্মের শব্দে ঘুমটা ভাঙল। চোখের পাতা খুলতেই দেখলাম সকালের একফালি নরম রোদ জানলার পর্দা গলে সোজা এসে পড়েছে আমার মুখের ওপর।
বিছানা ছেড়ে আস্তে আস্তে উঠলাম। অদ্ভুত ব্যাপার, ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর আর মনটা কেমন যেন হালকা হালকা লাগছিল। ঠিক যেন ভোরের একটা মুক্ত পাখি, ইচ্ছে করছে এক্ষুনি ডানা মেলে কলকাতার নীল আকাশে উড়ে যাই!
...
এই রে, কেস খেয়েছে! আমি আবার রাতারাতি কবি হয়ে গেলাম কবে থেকে? নাকি মৃত্যুর কাউন্টডাউন শুরু হলে মানুষের ভেতরের সুপ্ত কবিসত্তা এভাবে চাগাড় দিয়ে ওঠে?
না, ওসব ফালতু আবেগ ঝেড়ে ফেলে সোজা বাথরুমে গেলাম। ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে, টুথব্রাশ দিয়ে ঘষে ঘষে মুখটা পরিষ্কার করে নিলাম। তারপর ড্রইংরুমে আসতেই মনের ভেতর অদ্ভুত এক মরিয়া উত্তেজনা টের পেলাম।
হাতে তো আর মাত্র ন’টা দিন আছে। তারপর তো ওই আন্তর্জাতিক কুখ্যাত গ্যাং-এর হিটম্যান এসে কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে মাথা ফুটো করে দিয়ে যাবে। তা হলে এই কটা দিনও কি আমি এই স্যাঁতসেঁতে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে একা একা রুটি আর পেঁপের তরকারি করব? নিজের ওপর এই অত্যাচার সহ্য করব?
কভি নেহি! আর কখনই নয়!
আজ থেকে আমার ডায়েট চার্ট হবে রাজকীয়। সকালে ফুলকো লুচি, কষা আলুরদম, গরম ঘুগনি, মুচমুচে কাটলেট আর রসগোল্লা। বিকেলে জম্পেশ বিরিয়ানি। আর রাতে রুমালি রুটি আর চানা মটর! ব্যস, আর কোনো হিসেব-নিকেশ নেই।
তাই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে জামাটা কোনোমতে গলিয়ে সোজা হাঁটা দিলাম পাড়ার মোড়ের ‘খাবো খাবো’ রেস্টুরেন্টের দিকে। টেবিলে বসে অর্ডার দিয়ে একদম জম্পেশ করে খেলাম। কী আর বলব ভাই, ফুলকো লুচি আর আলুরদমের যা কম্বিনেশন হয়েছিল, তার কোনো তুলনা হয় না। আলুরদমের গ্রেভিটা যা বানিয়েছিল না, ওফ! মুখে দিলেই স্বর্গ! ঘুগনিটাও বেশ খাসা ছিল, আর কাটলেটটা আপাতত বাজেটের কথা ভেবে ডিমেরই নিয়েছিলাম, কিন্তু অপূর্ব খেতে হয়েছিল—বাইরেটা কী সুন্দর করকরে আর মুচমুচে!
খাওয়া তো হলো, এবার শরীরটাকে একটু নাড়াচাড়া করার জন্য ভাবলাম পার্কে যাওয়া যাক।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনের আনন্দে বিশাল পার্কটার ভেতর ঢুকে একেবারে হেড়ে গলায় গান ধরলাম, “ধন্যধান্যে পুষ্প ভরা, আমাদের এই—”
এই এক মিনিট! এটা কী গাইছি হে ভগবান! ধুর ধুর, এতটা এখনো নার্ভাস হয়ে আছি যে দ্বিজেন্দ্রলাল আর রবীন্দ্রনাথ গুলিয়ে ফেলছি! মরার আগে মাথাটা যে পুরোপুরি গেছে, সেটা এবার প্রমাণিত হলো।
লজ্জা পেয়ে পার্কের একটা ফাঁকা বেঞ্চে ধপ করে বসে পড়লাম। এখনো পর্যন্ত আমার নার্ভগুলো পুরোপুরি শক্ত হয়নি। তার ওপর উৎসাহের চোটে একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছি বোধহয়। পরপর তিনখানা তারস্বরে ঢেকুর উঠল।
আমি উদাসভাবে আকাশের দিকে তাকালাম। যদি সেদিন সুবীরের ঘরে গিয়ে ওইসব ফালতু অনলাইন আইডিয়া মাথায় না আসত, তাহলে আজ কী হতো? নিশ্চিতভাবে চেম্বারে বসে শান্তিতে পেশেন্টের নোংরা দাঁত তুলতাম। বোরিং লাইফ ছিল ঠিকই, কিন্তু অন্তত প্রাণের ভয়টা ছিল না। সত্যি কথা বলতে কী, এখন আমার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল ওই একপা কাটা আধপাগলা পেশেন্টটার ওপর। ও-ই তো যত নষ্টের গোড়া! ও চেম্বারে এসেই তো যত্ত সব উল্টোপাল্টা ষড়যন্ত্রের কথা—
“এক্সকিউজ মি?”
হঠাৎ একটা কাঁপাকাঁপা গলার আওয়াজে আমার চিন্তাভাবনা কেটে গেল। আমি না তাকিয়েই নিজের মনে বলে উঠলাম, “ইউ আর এক্সকিউজড।”
...
বলার ঠিক দুই সেকেন্ড পর খেয়াল হলো যে ভুল করে কী উল্টোপাল্টা বলে ফেলেছি। নিজের জিভ কাটলাম! এ হে, কী কেলেঙ্কারি!
আমি ঝট করে মুখ তুলে মানুষটার দিকে চোখ মিটমিট করে তাকালাম। সামনে একজন বছর কুড়ির মহিলা দাঁড়িয়ে আছে নাকি?
না না না, এক মিনিট! দেখতে একটু ভুল হয়েছিল এখানে। দূর থেকে বা প্রথম নজরে ফট করে এই মানুষটাকে মহিলা ভেবে অনেকেই ভুল করবে, কারণ মাথায় বেশ লম্বা চুল আর টানটান গড়ন। কিন্তু কন্ঠস্বর শুনে আর একটু ভালো করে তাকাতেই বুঝতে পারলাম—ইনি কোনো মহিলা নন, একজন শান্তশিষ্ট, নিরীহ চেহারার বালক।
তা ভালো। কিন্তু এই বালক এই সাতসকালে আমার মতো এক আধপাগলা উটকো লোকের কাছে কী চায়?
ছেলেটা আর একটু এগিয়ে এসে আমার দিকে একটা চামড়ার মানিব্যাগ বাড়িয়ে দিল।
“আমার নাম দাই লি, স্যার। পার্কের গেটের কাছে আপনার এই মানিব্যাগটা পড়ে গিয়েছিল, আমি ফেরত দিতে এলাম। ভেতর থেকে কিছু নিইনি। আপনি একবার চেক করে নিন।”
অ্যাঁ! আমার মানিব্যাগ কখন পড়ল?
আমি তড়িঘড়ি করে ওর হাত থেকে মানিব্যাগটা নিয়ে পকেট হাতড়ালাম। কিন্তু ব্যাগটা খুলতেই আমার হাতটা থমকে গেল। এক মিনিট, এটা তো আমার মানিব্যাগ নয়! একটা সম্পূর্ণ খালি, সস্তা ব্যাগ!
আমি অবাক হয়ে চেঁচালাম, “এই ভাই! এটা তো—”
কথাটা শেষ করার জন্য মুখ তুললাম, কিন্তু সামনে কেউ কোথাও ত্রিসীমানায় নেই! পার্কের চওড়া রাস্তাটা পুরো ফাঁকা।
কী অদ্ভুত অবস্থা রে বাবা! দুনিয়ায় চোর পকেট মেরে মানিব্যাগ লুট করে নিয়ে গেছে শুনেছি, কিন্তু যেচে এসে অচেনা লোককে নতুন খালি মানিব্যাগ দিয়ে উধাও হয়ে যায়, এটা তো বাপের জন্মে শুনিনি কখনো!
আমি আর একবার ভালো করে নজর দিলাম ওটার ওপর। না, ব্যাগটা পুরোপুরি খালি নয়। ভেতরের একটা পকেটে একটা ছোট চৌকো খবরের কাগজের ছেঁড়া টুকরো রয়েছে। আমি একটু ইতস্তত করে পেপারটা হাতে নিলাম। আর সেটা চোখের সামনে ধরতেই আমার চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হলো!
কাগজের টুকরোয় কাঁপাকাঁপা বাংলায় লেখা:
“আজ বিকেল ৫টার সময় মিত্রবাড়ির পেছনদিকে আসবেন, টর্চ নিয়ে। একটা জরুরি কথা আছে। আসার সময় দয়া করে সঙ্গে ৫টা গরম সিঙ্গাড়া আনবেন, বহুদিন ধরে ভালো কিছু খাইনি।
ইতি,
লি মিং”
চিঠিটা পড়ে আমি শক্ত হয়ে গেলাম। আস্তে করে চোখ দুটো বন্ধ করলাম।
হে ঈশ্বর!
-- ৯ দিন বাকি --