অনুব্রত ক্যাসেট বন্ধ করতে গেলো কিন্তু বোতাম কাজ করলো না। শব্দ বাড়তে লাগলো ।
"তুমি কি মনে রেখেছো, সেদিন দরজা বন্ধ করার সময় আমি তোমাকে কী বলেছিলাম?"
অনুব্রতর হাত কাঁপতে লাগলো । তার মনে পড়ছে না। সে মনে করতে চায় না।
ক্যাসেটের ভিতর থেকে কুসুমের গলা আবার শোনা গেলো।
"আমি বলেছিলাম, ভয় পেয়ো না। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না।"
অনুব্রত চোখে জল এসে গেলো।
"বন্ধ করো!"
কিন্তু ক্যাসেট থামল না।
"আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি, অনুব্রত।"
তারপর দীর্ঘ নীরবতা।
অনুব্রত ভাবলো , সব শেষ।
ঠিক তখনই ক্যাসেটের ভিতর থেকে অন্য একটি গলা শোনা গেলো।
একটি পুরুষের গলা। তার নিজের গলা।
"কুসুম, দরজা খোলো। আমি এসেছি।"
অনুব্রত চমকে উঠলো । ক্যাসেটে তার নিজের গলা কী করে? সে তো কখনো ওই কথাগুলো বলেনি।
কিন্তু পরের মুহূর্তে সে শুনল, দরজার ওপাশ থেকে আরেকটি গলা উত্তর দিচ্ছে।
"তুমি তো ইতিমধ্যেই ভিতরে আছো , অনুব্রত।"
ক্যাসেট বন্ধ হয়ে গেলো। একই মুহূর্তে তার ঘরের সমস্ত ঘড়ি থেমে গেলো।
রাত দুটো তেরো মিনিটে ।
অনুব্রত ধীরে ধীরে মাথা তুলল। ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন মহিলা।
সাদা শাড়ি। খোলা চুল। মুখটা অন্ধকারে ঢাকা। অনুব্রতর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।
মহিলাটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
সেই মুখ তার মায়ের ।
অনুব্রতর মা এক পা এক পা করে অনুব্রতর দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো ।
অনুব্রত পিছিয়ে যেতে চাইল। পারল না। তার পা মেঝের সঙ্গে আটকে গেছে।
অনুব্রতর মা মৃদু হেসে বললো — "বাবা, এতদিন কোথায় ছিলি?" "চল… বাড়ি যাবি না?"
অনুব্রত কাঁপতে কাঁপতে বললো , "না..."
অনুব্রতর মা হাসল তারপর বললো , "কিন্তু তুই তো এখনও বাড়ি ফিরিসনি।"
তারপর সারা ঘর একটা সাদা ধোঁয়ায় ভরে গেলো আর ঘরের সব আলো নিভে গেলো।
পরেরদিন সকালে অনুব্রতর বাড়ির দরজা খোলা অবস্থায় পাওয়া গেলো। ঘরের ভিতরে সবকিছু স্বাভাবিক। টেবিলের উপর রাখা ঠান্ডা চায়ের কাপ। চেয়ারের উপরে রাখা অনুব্রতর জামা। মেঝেতে পড়ে থাকা বাবার চিঠি কিন্তু অনুব্রত নেই।
পুলিশ তদন্ত করলো। কেউ তাকে অপহরণ করেনি। বাড়িতে জোর করে ঢোকারও কোনো চিহ্ন নেই। জানালাগুলোও ভিতর থেকে বন্ধ ছিলো ।
কেউ বুঝতে পারলো না, অনুব্রত কোথায় গেলো !!!!!
তারপর তিন মাস কেটে গেলো ……।
জমিদারবাড়িটাকে সরকারিভাবে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। কিন্তু ভাঙার কাজ শুরু হওয়ার আগের রাতে শ্রমিকদের কয়েকজন দাবি করলো , জমিদারবাড়ির ভিতর থেকে শোনা যাচ্ছিলো একটা অস্পষ্ট কান্নার শব্দ । আবার একজন বললো , উত্তর দিকের করিডরে সাদা শাড়ি পরা এক মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে আর একজন বললো , বাড়ির ছাদে একজন পুরুষকে হাঁটতে দেখেছে। তার মুখটা অনুব্রত চৌধুরীর মতো।
শ্রমিকেরা আর কাজ করতে রাজি হলো না। পরদিন সকালে ইঞ্জিনিয়ার বাড়ির নকশা পরীক্ষা করতে গিয়ে অদ্ভুত একটি বিষয় আবিষ্কার করলো। সরকারি নকশায় বাড়িতে বারোটি ঘর কিন্তু নতুন করে তৈরি করা একটি নকশায় দেখা গেলো , বাড়িতে এখন তেরোটি ঘর যেটা একদম উত্তর দিকের করিডরের শেষ প্রান্তে। একটি নতুন দরজা। দরজার উপরে ঝুলছে পিতলের ফলক।
তাতে লেখা রয়েছে ১৩ ।
গ্রামের লোকেরা বলে, অমাবস্যার রাতে এখনও বাড়ির ভিতর থেকে তিনজনের গলার শব্দ শোনা যায়।
একটি মৃণালিনী দেবীর , একটি কুসুমের আর একটি অনুব্রতর।
মৃণালিনী দেবী কাঁদতে কাঁদতে বলে, "আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও।"
কুসুম মৃদু গলায় বলে, "আমি কাউকে মারিনি।"
আর অনুব্রত বারবার একই কথা বলে— "দরজাটা খোলো। আমাকে বের হতে দাও।"
কিন্তু কেউ দরজা খোলে না।
কারণ, গ্রামের লোকেদের বিশ্বাস, তেরো নম্বর ঘরের ভিতরে এখনো একজন মানুষ বন্দি হয়ে আছে।
সে খুনি নয়। সে ভূতও নয়। সে এমন একজন, যে নিজের অপরাধের শাস্তি পাচ্ছে আর সেই শাস্তির কোনো শেষ নেই।
বাড়িটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার ভাঙা জানালার কাঁচে মাঝেমধ্যে আলো জ্বলে ওঠে।
দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ভিতরে কেউ একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে আছে।
কেউ যদি গভীর রাতে বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে শোনে, তবে কাঠের দরজায় তিনবার আঘাতের শব্দ পাবে।
ঠক… ঠক… ঠক …।
তারপর ভেসে আসবে একটি পরিচিত গলা।
"দরজাটা খোলো।"
"আমি অনুব্রত…।" "আমি এখনও বেঁচে আছি…. ।"
আর ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির সমস্ত ঘড়ি থেমে যায়।
রাত দুটো তেরো মিনিটে …।
সমাপ্ত