মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-৫৩
মহর্ষি লোমশ বর্ণিত বিষ্ণুর বরাহ অবতারের কাহিনি ও যুধিষ্ঠিরাদির বদরিকাশ্রম গমন
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
মহর্ষি লোমশ বর্ণিত বিষ্ণুর বরাহ অবতারের কাহিনি ও যুধিষ্ঠিরাদির বদরিকাশ্রম গমন
মহর্ষি লোমশের কাছে ভরদ্বাজ, যবক্রীত, রৈভ্য, অর্বাবসু ও পরাবসুর কাহিনি শোনার পর উশীরবীজ, মৈনাক পর্বত, শ্বেতগিরি এবং কালশৈল পার কোরে যুধিষ্ঠিরাদি সপ্তধারা গঙ্গার নিকট উপস্থিত হলেন। লোমশ বললেন, এখন আমরা মণিভদ্র ও কৈলাসে যাব। সেই দুর্গম স্থান গন্ধর্ব, কিন্নর, যক্ষ ও রাক্ষসগণ কর্তৃক রক্ষিত, তোমরা সতর্ক হয়ে চলো। যুধিষ্ঠির বললেন, ভীম, তুমি দ্রৌপদী ও অন্য সকলের সঙ্গে এই গঙ্গাদ্বারে অপেক্ষা করো, কেবল আমি নকুল ও মহর্ষি লোমশ এই তিনজন সতর্ক হয়ে এই দুর্গম পথে যাত্রা করবো। ভীম বললেন, অর্জুনকে দেখবার জন্য দ্রৌপদী এবং আমরা সকলেই উৎসুক হয়ে আছি। এই দুর্গম স্থানে আপনাকে আমি ছেড়ে দিতে পারি না। দ্রৌপদী বা নকুল-সহদেব যেখানে চলতে পারবেন না সেখানে আমি তাদের বহন করে নিয়ে যাবো। ভীমের কথা শুনে দ্রৌপদী বললেন, আমি চলতে পারবো, আমার জন্য ভেবো না।
যুধিষ্ঠিরাদি সকলে পুলিন্দরাজ সুবাহুর বিশাল রাজ্যে উপস্থিত হলেন এবং সসম্মানে সেখানে সুখে রাত্রিযাপন করলেন। পরদিন সূর্যোদয় হলে পাচক ও পরিচারকদের পুলিন্দরাজের নিকটে রেখে তারা পদব্রজে হিমালয় পর্বতের দিকে যাত্রা করলেন। যেতে যেতে এক স্থানে এসে লোমশ বললেন, দূরে ওই যে কৈলাস পর্বতের মতো বিশাল সুদৃশ্য স্তুপ দেখছ তা নরকাসুরের অস্থি। নরকাসুর তপস্যার প্রভাবে ও বাহুবলে দুর্ধর্ষ হয়ে দেবগণের উপর উৎপীড়ন করতো। ইন্দ্রের প্রার্থনায় বিষ্ণু শুধুমাত্র হাত দিয়ে স্পর্শ কোরে সেই অসুরকে হত্যা করেন।
তারপর লোমশ বরাহরূপী বিষ্ণুর কাহিনি বললেন - সত্যযুগে এক সময় আদিদেব বিষ্ণু যমের কর্তব্য নিজেই পালন করতেন। তখন কারো মৃত্যু হোতো না, কেবল জন্মগ্রহণ করতো। যার ফলে, পশু, পাখি, মানুষ প্রভৃতির সংখ্যা এত হোলো যে তাদের গুরুভারে বসুমতী শত যোজন নীচে চলে গেলেন। বসুমতী সর্বাঙ্গে বেদনা নিয়ে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলেন। তখন বিষ্ণু রক্তনয়ন একদন্ত ভীষণাকার বরাহের রূপ ধারণ কোরে পৃথিবীকে দাঁত দিয়ে ধারণ করে শত যোজন উপরে তুলে আগের জায়গায় স্থাপন করলেন। এই ঘটনায় সমগ্র পৃথিবী দুলতে থাকলে দেবতা ঋষি প্রভৃতি সকলেই ভীত হয়ে ব্রহ্মার নিকটে গেলে, ব্রহ্মা আশ্বাস দিয়ে তাঁদের ভয় দূর করলেন।
পাণ্ডবগণ গন্ধমাদন পর্বতে উপস্থিত হোলে প্রবল ঝড়বৃষ্টি হোতে লাগল, তখন সকলে ভীত হয়ে বড় বড় গাছের নীচে আশ্রয় নিলেন। দুর্যোগ থেমে গেলে তারা আবার চলতে লাগলেন। এক ক্রোশ যাওয়ার পর দ্রৌপদী ক্লান্ত ও অবশ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। যুধিষ্ঠির তাকে কোলে নিয়ে বিলাপ কোরে বলতে লাগলেন - আমি পাপী, আমার কর্মের ফলেই ইনি শোকে ও পথ চলার কষ্টে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে গেছেন। ধৌম্য প্রভৃতি ঋষিগণ শান্তির জন্য মন্ত্র জপ করলেন, পাণ্ডবগণ দ্রৌপদীকে মৃগচর্মের উপর শুইয়ে তার সেবা করতে লাগলেন। যুধিষ্ঠির ভীমকে বললেন, বরফে ঢাকা দুর্গম গিরিপথে দ্রৌপদী কি করে যাবেন? তখন ভীম স্মরণ করা মাত্র মহাবাহু ঘটোৎকচ সেখানে এসে করজোড়ে বললেন, আজ্ঞা করুন কি করতে হবে। ভীম বললেন, বৎস, তোমার মা পরিশ্রান্ত হয়েছেন, এঁকে বহন করে নিয়ে চলো। তুমি এঁকে কাঁধে নিয়ে আমাদের নিকটবর্তী হয়ে আকাশপথে চলো, যেন এঁর কষ্ট না হয়।
ভীমের আদেশে ঘটোৎকচ দ্রৌপদীকে বহন করে নিয়ে চললেন, তাঁর অনুচর অন্য রাক্ষসরা পাণ্ডব ও ব্রাহ্মণদের নিয়ে চললো, কেবল মহর্ষি লোমশ তপস্যার প্রভাবে আকাশপথে এগিয়ে চললেন। বদরিকাশ্রমে উপস্থিত হয়ে সকলে রাক্ষসদের কাঁধ থেকে নেমে নরনারায়ণের রমণীয় আশ্রম দর্শন করলেন। সেখানকার মহর্ষিগণ যুধিষ্ঠিরাদিকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে যথাবিধি অতিথি সৎকার করলেন। সেই আনন্দজনক অতি দুর্গম স্থানে বিশাল বদরী গাছের নিকটে ভাগীরথী নদী প্রবাহিত হচ্ছে। যুধিষ্ঠিরাদি সেখানে পিতৃগণের তর্পণ করলেন।
______________
(ক্রমশ)