Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 55

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-৫৫

ভীমের জটাসুর বধ এবং যক্ষ ও রাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধ

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

ভীমের জটাসুর বধ এবং যক্ষ ও রাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধ

যুধিষ্ঠিরাদি যখন বদরিকাশ্রমে বাস করতেন তখন জটাসুর নামে এক রাক্ষস ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে পাণ্ডবদের সঙ্গে বাস করতো। সর্বশাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ বলে সে নিজের পরিচয় দিত এবং যুধিষ্ঠির তাকে কোনো সন্দেহ করেননি। একদিন ভীম যখন শিকারে গেছেন, ঘটোৎকচ ও তার অনুচর রাক্ষসরাও আশ্রমে নেই এবং লোমশ প্রভৃতি মহর্ষিরা ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন, এই সুযোগে জটাসুর বিকট রূপ ধারণ করে যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব, দ্রৌপদী এবং পাণ্ডবদের সমস্ত অস্ত্র হরণ করে তাদেরকে জাপটে ধরে নিয়ে দ্রুতগতিতে চললো। সহদেব অনেক চেষ্টা করে তার বাহুপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করলেন এবং উচ্চকণ্ঠে ভীমকে ডাকতে লাগলেন। যুধিষ্ঠির জটাসুরকে বললেন, দুরাত্মা, তুমি আমাদের সঙ্গে আশ্রমে সসম্মানে বাস কোরে এবং আমাদের অন্ন খেয়ে কেন আমাদেরকে এইভাবে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? দ্রৌপদীকে স্পর্শ করার ফলে তুমি তোমার মৃত্যুকে ডেকে এনেছো।

যুধিষ্ঠির নিজের শরীরের ওজন বৃদ্ধি করলেন, তাতে রাক্ষসের গতি কমে গেল। সহদেব বললেন, মহারাজ, আমি এর সঙ্গে যুদ্ধ করবো, সূর্যাস্তের পূর্বেই যদি একে বধ করতে না পারি তবে আমি নিজেকে ক্ষত্রিয় বলবো না। সহদেব যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হলেন। এমন সময়ে গদা হাতে ভীম সেখানে এলেন। ভীম রাক্ষসকে বললেন, পাপী, তুমি যখন আমাদের অস্ত্রশস্ত্রের দিকে লক্ষ্য করতে তখনই তোমাকে আমি চিনেছিলাম, কিন্তু তুমি ব্রাহ্মণবেশী অতিথি হয়ে আমাদের প্রিয়কার্য করতে এজন্য বিনা অপরাধে তোমাকে বধ করিনি। এখন বক আর হিড়িম্ব রাক্ষস যেখানে গেছে তোমাকেও সেখানে পাঠাবো। জটাসুর যুধিষ্ঠিরাদিকে ছেড়ে দিয়ে ভীমকে বললো, তুমি যেসব রাক্ষস বধ করেছো, আজ তোমার রক্তে তাদের তর্পণ করবো।

ভীম ও জটাসুরের মধ্যে সাংঘাতিক মল্লযুদ্ধ হোতে লাগলো। নকুল-সহদেব সাহায্য করতে এলে ভীম তাদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমি একে একাই মারতে পারবো, তোমরা দাঁড়িয়ে দেখো। ভীমের মুষ্টির আঘাতে রাক্ষস ক্রমশ শ্রান্ত হয়ে পড়ল, তখন ভীম প্রচণ্ড প্রহার কোরে তার সর্বাঙ্গ চূর্ণ করে দিলেন আর জটাসুরের মাথা ছিঁড়ে ফেললেন।

বদরিকাশ্রমে থাকাকালিন একদিন যুধিষ্ঠির বললেন, আমাদের বনবাসের চার বছর নিরাপদে কেটে গেছে। অস্ত্রশিক্ষার জন্য দেবলোকে যাবার সময় অর্জুন বলেছিলেন যে পাঁচ বছর পূর্ণ হলে তিনি কৈলাস পর্বতে আমাদের সঙ্গে মিলিত হবেন। অতএব আমরা কৈলাসে গিয়েই তার প্রতীক্ষা করবো। যুধিষ্ঠিরাদি, লোমশ ও অন্যান্য ব্রাহ্মণগণ এবং ঘটোৎকচ ও তাঁর অনুচরগণ সতেরো দিনে হিমলায়ের কাছে হলেন। তারপর তারা গন্ধমাদন পর্বতের নিকটে রাজর্ষি বৃষপর্বার পবিত্র আশ্রমে এলেন। সেখানে সাত রাত্রি সুখে বাস করার পর অতিরিক্ত জিনিষপত্র বৃষপর্বার কাছে রেখে তারা উত্তর দিকে যাত্রা করলেন। পাণ্ডবদের সঙ্গে থাকা ব্রাহ্মণগণ বৃষপর্বার আশ্রমেই রইলেন। যুধিষ্ঠিরাদি, দ্রৌপদী, লোমশ ও ধৌম্য চতুর্থ দিনে কৈলাস পর্বতের নিকটে পৌঁছে গেলেন। তার পর তারা মাল্যবান পর্বত পেরিয়ে গন্ধমাদন পর্বতে রাজর্ষি আর্চিযেণের আশ্রমে উপস্থিত হলেন। উগ্রতপা ধর্মজ্ঞ আর্চিযেণ তাদের সাদরে অভ্যর্থনা কোরে বললেন, বৎস যুধিষ্ঠির, তোমরা এখানেই অর্জুনের জন্য অপেক্ষা করো। পাণ্ডবগণ সুম্বাদু ফল, হরিণের মাংস, মধু এবং মুনিগণের দেওয়া অন্যান্য খাদ্য খেয়ে এবং লোমশের মুখে বিবিধ কাহিনি শুনে বনবাসের পঞ্চম বছর যাপন করলেন।

ঘটোৎকচ তার অনুচরদের সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন। একদিন দ্রৌপদী ভীমকে বললেন, তোমার ভাই অর্জুন খাণ্ডবদাহনের সময় গন্ধর্ব, নাগ, রাক্ষস এবং ইন্দ্রকেও পরাজিত করেছিলেন। তিনি দারুণ মায়াবীদের বধ করেছেন, গাণ্ডীব ধনুও লাভ করেছেন। তোমারও ইন্দ্রের মতো তেজ ও বাহুবল আছে। তুমি এখানকার রাক্ষসদের তাড়িযে দাও, আমরা সকলে এই রমণীয় পর্বতের উপরের অংশ দেখবো।

ভীম দ্রৌপদীর কথা শুনে সশস্ত্র হয়ে পর্বতশৃঙ্গে উঠলেন। সেখান থেকে তিনি কুবেরের ভবন দেখতে পেলেন। তার প্রাসাদসমূহ সোনা ও স্ফটিকে নির্মিত, সমস্ত দিক সোনার পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এবং নানাপ্রকার উদ্যানে শোভিত। কিছুক্ষণ বিষগ্ন মনে চুপচাপ থেকে কুবেরের পুরী দেখে ভীম শঙ্খ বাজালেন ও জোরে করতালি দিলেন। শব্দ শুনে যক্ষ, রাক্ষস ও গন্ধর্বগণ দ্রুতবেগে আক্রমণ করতে এলো। ভীমের অস্ত্রাঘাতে অনেকে বিনষ্ট  হল অবশিষ্ট সকলে পালিয়ে গেল। তখন কুবেরের সখা মণিমান নামক মহাবল রাক্ষস শক্তি, শূল ও গদা নিয়ে যুদ্ধ করতে এলেন, কিন্তু ভীম তাঁকেও গদাঘাতে বধ করলেন।

যুদ্ধের শব্দ শুনে যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে আর্চিযেণের কাছে রেখে নকুল-সহদেবের সঙ্গে সশস্ত্র হয়ে পর্বতের উপরে উঠলেন। মহাবাহু ভীম বহু রাক্ষস সংহার করে ধনু আর গদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেখে যুধিষ্ঠির তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ভীম, তুমি হঠকারিতার বশে অকারণে রাক্ষস বধ করেছ, এতে দেবতারা ক্রুদ্ধ হবেন। এমন কাজ আর কোরো না।

ভীম দ্বিতীয়বার রাক্ষসদের বধ করেছেন শুনে কুবের ক্রুদ্ধ হয়ে পুষ্পক বিমানে গন্ধমাদন পর্বতে এলেন। পাণ্ডবগণ রোমাঞ্চিত হয়ে যক্ষ ও রাক্ষস পরিবেষ্টিত সুদর্শন কুবেরকে দেখতে লাগলেন। কুবেরও অস্ত্রধারী মহাবল পাণ্ডবগণকে দেখে এবং তারা দেবতাদের প্রিয় সমস্ত কাজ করবেন জেনে প্রীত হলেন। যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেব কুবেরকে প্রণাম করলেন এবং ভীম নিজেকে অপরাধী মনে করে হাতজোড় কোরে দাঁড়িয়ে রইলেন। ভীম খড়্গ ও গদা হাতে নিয়ে কুবেরকে দেখতে লাগলেন।

কুবের যুধিষ্ঠিরকে বললেন, তুমি সর্বদা প্রাণীগণের মঙ্গল করো তা সকলেই জানে।| তোমার ভাইদের সঙ্গে তুমি নির্ভয়ে এই পর্বতের উপরে বাস করো। ভীমের হঠকারিতার জন্য ক্রুদ্ধ বা লজ্জিত হয়ো না, এই যক্ষ ও রাক্ষসদের বিনাশ হবে তা দেবতারা আগেই জানতেন। তার পর কুবের ভীমকে বললেন, বৎস, তুমি দ্রৌপদীর জন্য আমাকে ও দেবগণকে অগ্রাহ্য করে এই যে সাহসের কাজ করেছ, তাতে আমি খুশি হয়েছি, তুমি আমাকে শাপমুক্ত করেছ। অনেক দিন আগে কুশবতী নগরীতে যখন দেবগণের মন্ত্রণাসভা হয় তখন আকাশপথে সেখানে যাবার সময় আমি মহর্ষি অগস্ত্যকে দেখেছিলাম, তিনি যমুনাতীরে তপস্যা করছিলেন। আমার সখা রাক্ষসপতি মণিমান মূর্খতা, মোহ ও অহঙ্কারের বশে অগস্ত্যের মস্তকে থুথু ফেলেছিলেন। তাতে ভয়ঙ্কর ক্রোধে অগস্ত্য আমাকে বললেন, তোমার এই দুরাত্মা সখা সসৈন্যে মানুষের হাতে মরবে, তুমিও সৈন্য বিনাশের জন্য দুঃখ ভোগ করবে, সেই সৈন্যদের হত্যাকারী মনুষ্যকে দেখে পাপমুক্ত হবে।

তার পর কুবের যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ভীম ধর্মজ্ঞানহীন, অহঙ্কারী, অল্পবুদ্ধি, অসহিষ্ণু ও নির্ভিক, একে তুমি শাসনে রেখো। রাজর্ষি আর্চিযেণের আশ্রমে ফিরে গিয়ে তুমি সেখানে কৃষ্ণপক্ষ যাপন করো, আমার নিযুক্ত গন্ধর্ব, যক্ষ, কিন্নর ও পর্বতবাসিগণ তোমাদের রক্ষা করবে এবং খাদ্য ও পানীয় এনে দেবে। কুবেরকে প্রণাম কোরে ভীম তার গদা, খড়্গ ও ধনু প্রভৃতি অস্ত্র সমর্পণ করলেন। ভীমকে কুবের বললেন, বৎস, তুমি শত্রুগণের গৌরব নাশ করো, শুভানুধ্যায়ীদের আনন্দ বর্ধন করো। এই গন্ধমাদন পর্বতে সকলে নির্ভয়ে বাস করো। অর্জুন শীঘ্রই তোমাদের সঙ্গে মিলিত হবেন। এই বলে কুবের ফিরে গেলেন।

______________

(ক্রমশ)