''অন্ধকারের সিঁড়ি''
রায় ভিলার নিচে নেমে যাওয়া সিঁড়িটার দিকে তাকিয়ে তিনজনই নিঃশব্দ।
নিচ থেকে ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছে।
সেই বাতাসে যেন ভেজা মাটির গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে বহু বছরের লুকিয়ে থাকা স্মৃতি।
আরোহী মেঘলার হাত আরও শক্ত করে ধরল।
তার বুক ধড়ফড় করছে।
তবু সে নিজের চোখ সরাল না।
অন্ধকারের ভেতরে যে নীল দুটো চোখ জ্বলছিল...
সেগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
যেন কেউ ছিলই না।
অর্ণব টর্চ জ্বালিয়ে নিচের দিকে তাকাল।
— "কেউ নেই..."
মেঘলা আস্তে বলল,
— "না... কেউ ছিল।"
আরোহী প্রশ্ন করল,
— "তুমি দেখেছ?"
মেঘলা মাথা নাড়ল।
— "শুধু দেখিনি... ওর গলাটাও চিনেছি।"
অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
— "অসম্ভব!"
মেঘলার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
— "অসম্ভব হলেও সত্যি..."
সে আর কিছু বলল না।
ধীরে ধীরে তারা সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।
প্রথম ধাপ...
দ্বিতীয় ধাপ...
তৃতীয় ধাপ...
প্রতিটি ধাপেই ধুলো জমে আছে।
মনে হচ্ছে বহু বছর কেউ এখানে আসেনি।
কিন্তু দশ নম্বর ধাপে পৌঁছাতেই আরোহী থেমে গেল।
ধুলোর ওপর স্পষ্ট জুতোর ছাপ।
একজন নয়।
দুজন নয়।
চারজন মানুষের পায়ের ছাপ।
আর সবগুলোই একেবারে নতুন।
অর্ণব নিচু হয়ে দেখল।
তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
— "আমাদের আগেই কেউ এখানে নেমেছে।"
মেঘলা ফিসফিস করে বলল,
— "তাহলে... ওরা ডায়েরিটার খোঁজে এসেছে।"
আরোহী অবাক।
— "কোন ডায়েরি?"
— "যেটার কথা মা চিঠিতে লিখেছিলেন।"
সিঁড়ির শেষ প্রান্তে একটা বিশাল কাঠের দরজা।
দরজার ওপরে লোহার ফলকে লেখা—
ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার
অর্ণব দরজাটা ঠেলে খুলতেই...
ক্যাঁচ...
পুরোনো কাগজের গন্ধে ভরে গেল চারপাশ।
এটা কোনো সাধারণ লাইব্রেরি নয়।
চারদিকে ছাদ ছোঁয়া বুকশেলফ।
হাজার হাজার বই।
মাঝখানে গোল টেবিল।
টেবিলের ওপর একটা কেরোসিন ল্যাম্প।
অদ্ভুত ব্যাপার...
ল্যাম্পটা নিজে থেকেই জ্বলছে।
কিন্তু এখানে তো কেউ নেই!
আরোহী আস্তে বলল,
— "কেউ কি... এখনও এই ঘরে আসে?"
অর্ণব উত্তর দিল না।
সে চারদিকে তাকিয়ে যেন কাউকে খুঁজছে।
হঠাৎ...
ঠাস!
পেছনের দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
আরোহী ছুটে গিয়ে দরজাটা টানল।
খুলল না।
সে জোরে ধাক্কা দিল।
তবু না।
মেঘলা শান্ত গলায় বলল,
— "ভয় পেও না।"
— "দরজা বন্ধ হয়ে গেল!"
— "এই ঘর কখনও কাউকে সহজে বেরোতে দেয় না।"
ঠিক তখনই...
বইয়ের তাকের মাঝখান থেকে খুব আস্তে একটা শব্দ এল।
ফস... ফস...
যেন কেউ বইয়ের পাতায় হাত বোলাচ্ছে।
আরোহী টর্চের আলো ফেলল।
কেউ নেই।
কিন্তু একটা মোটা নীল ডায়েরি নিজে থেকেই তাক থেকে নিচে পড়ে গেল।
ধুপ!
তিনজনই একসঙ্গে তাকাল।
মেঘলা খুব আস্তে বলল,
— "ওটাই..."
আরোহী ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
ডায়েরিটা তুলে নিল।
মলাটে কোনো নাম নেই।
শুধু রূপালি অক্ষরে লেখা—
"যে সত্য পড়বে, তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।"
আরোহীর গলা শুকিয়ে গেল।
সে প্রথম পাতাটা খুলল।
পাতার একেবারে ওপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
"এই ডায়েরি শুরু হচ্ছে আরোহী সেনকে দিয়ে..."
আরোহী হতভম্ব।
— "আমার নাম?"
পাতা উল্টাতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
প্রথম পাতায় লাগানো একটি পুরোনো ছবি।
ছবিতে দুটি ছোট মেয়ে।
একজনের হাতে নীল ফিতা।
অন্যজনের হাতে লাল বেলুন।
আর ছবির পেছনে লেখা—
"আরোহী আর মেঘলা। বন্ধুত্বের প্রথম দিন।"
আরোহীর শ্বাস থেমে গেল।
তার মনে হতে লাগল...
সে যেন এই মুহূর্তটা আগে কোথাও দেখেছে।
ঠিক তখনই...
লাইব্রেরির একেবারে শেষ প্রান্ত থেকে একটি কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এল—
"ডায়েরিটা বন্ধ করো। ওটা পড়ার অধিকার তোমার নেই।"
তিনজন একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল।
বইয়ের তাকের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল একটি ছায়ামূর্তি...
তার হাতে একটি পুরোনো রিভলভার।
রিভলভারটা সরাসরি আরোহীর দিকে তাক করা।
ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তে জমে গেল।
মেঘলা এক পা এগিয়ে এসে আরোহীর সামনে দাঁড়াল।
— "না!"
ছায়ামূর্তিটি শান্ত গলায় বলল,
— "সরে দাঁড়াও, মেঘলা।"
কণ্ঠটা কর্কশ হলেও অদ্ভুত পরিচিত।
অর্ণব টর্চের আলো সোজা লোকটার মুখে ফেলতেই সবাই থমকে গেল।
প্রায় পঞ্চাশ বছরের একজন মানুষ।
মুখভর্তি দাড়ি।
চোখে ক্লান্তি।
কিন্তু সেই চোখে ঘৃণা নেই...
বরং গভীর অনুশোচনা।
তিনি ধীরে ধীরে রিভলভারটা নিচু করে বললেন,
— "আমি কাউকে মারতে আসিনি।"
আরোহী অবাক হয়ে বলল,
— "তাহলে বন্দুক নিয়ে এসেছেন কেন?"
লোকটা তিক্ত হেসে উঠল।
— "এই বাড়িতে বন্দুক নিয়ে ঢুকলে মানুষকে ভয় দেখানো যায়... কিন্তু সত্যিটাকে নয়।"
মেঘলার মুখ হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
— "সৌমেন কাকু..."
লোকটা মৃদু মাথা নাড়লেন।
— "হ্যাঁ, মা।"
আরোহী বিস্ময়ে বলল,
— "আপনি ওকে চেনেন?"
সৌমেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— "ওকে আমি ছোট থেকে বড় হতে দেখেছি।"
অর্ণব কড়া গলায় বলল,
— "চার বছর পরে ফিরে এলেন কেন?"
সৌমেন কিছুক্ষণ চুপ রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে পকেট থেকে একটা পুরোনো চাবি বের করলেন।
চাবিটার মাথায় নীল রঙের সুতো বাঁধা।
— "কারণ... আজকের দিনটার জন্যই আমাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল।"
— "কে বলেছিল?"
— "ইলা দেবী।"
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
মেঘলা আস্তে বলল,
— "মা?"
— "হ্যাঁ। উনি জানতেন, একদিন আরোহী আবার এই বাড়িতে ফিরবে।"
আরোহী কেঁপে উঠল।
— "কিন্তু... উনি কীভাবে আমার কথা জানতেন?"
সৌমেন উত্তর না দিয়ে লাইব্রেরির এক কোণের দিকে হাঁটতে লাগলেন।
সেখানে একটা বিশাল বুকশেলফ।
তিনি চাবিটা দেয়ালের ছোট্ট তালায় ঢোকালেন।
ক্লিক...
তারপর...
গড়ররর...
পুরো বুকশেলফটা ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল।
পেছনে দেখা গেল একটি সরু গোপন ঘর।
ঘরের মাঝখানে কাঠের টেবিল।
টেবিলের ওপর একটি টেপ রেকর্ডার।
তার পাশে একটি সিল করা খাম।
খামের ওপর স্পষ্ট অক্ষরে লেখা—
"শুধু আরোহী আর মেঘলার জন্য।"
মেঘলার হাত কাঁপতে শুরু করল।
আরোহী ধীরে ধীরে খামটার দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই...
পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ একসঙ্গে জ্বলে উঠল।
যদিও এতক্ষণ বাড়িতে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না।
একটার পর একটা লাইট জ্বলতে লাগল।
উপরে...
নিচে...
করিডোরে...
বাগানে...
মনে হলো, বহু বছর পর রায় ভিলা আবার জেগে উঠেছে।
আর সেই আলো জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে...
দূরে কোথাও একটি মেয়ের হাসির শব্দ ভেসে এল।
খিলখিল...
কিন্তু এবার সেই হাসিটা মেঘলার নয়।
আরোহী ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
গোপন ঘরের দরজার বাইরে...
একটি ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার বয়স আট-নয় বছর।
চুলে নীল ফিতা।
সে মুচকি হেসে শুধু একটাই কথা বলল—
"আরোহী... এত দেরি করলে কেন?"
ঘরটা এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ছোট্ট মেয়েটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
চুলে নীল ফিতা।
সাদা ফ্রক।
তার মুখে এক অদ্ভুত মায়াভরা হাসি।
আরোহীর মনে হলো, সে যেন এই হাসিটা আগে কোথাও দেখেছে।
অনেক আগে...
খুব ছোটবেলায়।
— "তুমি... কে?"
মেয়েটি উত্তর দিল না।
সে শুধু হাত বাড়িয়ে বলল,
— "চলো। সবাই অপেক্ষা করছে।"
মেঘলা আচমকা চিৎকার করে উঠল—
— "না! ওর কাছে যেও না!"
ছোট্ট মেয়েটির হাসি মিলিয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে মেঘলার দিকে তাকাল।
— "তুমি এখনও আমাকে ভয় পাও?"
মেঘলার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
— "আমি তোমাকে ভয় পাই না..."
— "তাহলে সত্যিটাকে ভয় পাও?"
অর্ণব কয়েক পা এগিয়ে এল।
— "তুমি কী চাও?"
মেয়েটি শান্ত গলায় বলল,
— "যেটা চার বছর আগে হওয়ার কথা ছিল..."
হঠাৎ লাইব্রেরির সব লাইট একসঙ্গে নিভে গেল।
পুরো ঘর ডুবে গেল অন্ধকারে।
শুধু টেবিলের ওপর রাখা টেপ রেকর্ডারের লাল আলো জ্বলছে।
টিক...
নিজে থেকেই টেপটা চলতে শুরু করল।
প্রথমে শুধু শোঁ-শোঁ শব্দ।
তারপর...
একজন মহিলার কণ্ঠ ভেসে এল।
শান্ত।
ক্লান্ত।
কিন্তু ভালোবাসায় ভরা।
— "যদি এই রেকর্ডিং কেউ শোনো... তাহলে বুঝব, আমার আর সময় নেই..."
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
— "মা..."
রেকর্ডিং চলতে লাগল।
— "অর্ণব, যদি তুই এটা শুনিস... নিজেকে দোষ দেবি না। সব দোষ তোর নয়।"
অর্ণব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখ থেকে নীরবে জল পড়তে লাগল।
রেকর্ডিং আবার বলল—
— "আর মেঘলা... তুই সবসময় নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখিস। এবার আর লুকিয়ে রাখিস না।"
মেঘলা কাঁদতে শুরু করল।
আরোহী নিঃশব্দে তার হাতটা ধরে রাখল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর আবার সেই কণ্ঠ—
— "আরোহী... যদি তুই এই কথাগুলো শুনে থাকিস, তাহলে বুঝব ভাগ্য আবার তোমাদের এক করেছে।"
আরোহীর বুক ধক করে উঠল।
— "উনি... আমার নাম জানেন কীভাবে?"
রেকর্ডিংয়ে উত্তর যেন তার প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিল।
— "কারণ তুই এই বাড়িতে অতিথি হয়ে আসিসনি... তুই আমাদের পরিবারের গল্পেরই একটা অংশ।"
ঘরের সবাই স্তব্ধ।
ঠিক তখনই—
ঠাস!
লাইব্রেরির এক কোণে রাখা একটা পুরোনো কাঠের বাক্স নিজে থেকেই মাটিতে পড়ে গেল।
ঢাকনাটা খুলে গেল।
ভেতর থেকে ছড়িয়ে পড়ল শত শত পুরোনো ছবি।
একটা ছবি উড়ে এসে আরোহীর পায়ের কাছে থামল।
সে ছবিটা তুলে নিল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
একটা বাগান।
দুটি ছোট্ট মেয়ে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে।
একজনের চুলে নীল ফিতা।
অন্যজনের হাতে লাল বেলুন।
আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাসছেন সেই মহিলা।
ছবির পেছনে লেখা—
"বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি। যে-ই হোক, যেখানেই থাকি, একদিন আবার দেখা হবেই।"
তারিখটা দেখে আরোহীর চোখ বড় হয়ে গেল।
২০০৯।
সে ফিসফিস করে বলল,
— "আমি... সত্যিই এখানে এসেছিলাম..."
ঠিক তখনই তার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
একটার পর একটা ঝাপসা স্মৃতি ফিরে আসতে শুরু করল—
একটা দোলনা...
বৃষ্টিভেজা বিকেল...
একটা ছোট্ট মেয়ে বলছে—
"আমাকে ভুলে যেও না, আরু..."
আরোহী হঠাৎ দু'হাত দিয়ে মাথা চেপে মাটিতে বসে পড়ল।
তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে যাচ্ছে।
মেঘলা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
— "আরোহী! আমার দিকে তাকাও!"
ধীরে ধীরে আরোহী চোখ খুলল।
তার চোখে জল।
সে কাঁপা গলায় বলল—
"মেঘ... আমি তোমাকে আগে থেকেই চিনতাম... তাই না?"
মেঘলার চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সে খুব আস্তে মাথা নাড়ল।
— "হ্যাঁ..."
— "তুমি শুধু আমার প্রথম ভালোবাসা নও..."
সে বাকিটা শেষ করার আগেই—
ধাম!
লাইব্রেরির প্রধান দরজায় প্রবল আঘাত পড়ল।
একবার...
দু'বার...
তিনবার...
তারপর বাইরে থেকে একটি ভারী পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল—
"দরজা খোলো। খেলা শেষ। এবার আর কেউ এই বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে না।"
—
চলবে...