Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

যেখানে শুধু তুমি - পর্ব 7

পর্ব ৭: যে ফিরে এসেছিল
ধাম!
দরজায় আবার আঘাত পড়ল।
লাইব্রেরির কাঠের দরজাটা কেঁপে উঠল।
আরোহী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার চোখে এখনও ফিরে আসা স্মৃতির ছায়া।
মেঘলা তার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
অর্ণব দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল।
বাইরে আর কোনো শব্দ নেই।
অদ্ভুত নীরবতা।
হঠাৎ—
টক... টক...
এবার দরজায় খুব ভদ্রভাবে কড়া নাড়া হলো।
তারপর ভেসে এল শান্ত একটা কণ্ঠ—
— "দরজা খুলুন। আমি কাউকে আঘাত করতে আসিনি।"
অর্ণব ভ্রু কুঁচকে বলল,
— "এই গলাটা..."
সৌমেন কাকু মাথা নাড়লেন।
— "চিনি না।"
মেঘলা ফিসফিস করে বলল,
— "ফাঁদও হতে পারে।"
কিন্তু আরোহীর মনে অদ্ভুত একটা টান অনুভূত হলো।
যেন সে এই কণ্ঠস্বর আগে কোথাও শুনেছে।
দরজার নিচ দিয়ে একটি সাদা খাম ভেতরে ঢুকে এল।
চারজন একে অপরের দিকে তাকাল।
অর্ণব সাবধানে খামটা তুলে নিল।
খামের ওপর লেখা—
"আরোহী সেনের হাতে পৌঁছবে। অন্য কেউ খুলবে না।"
আরোহীর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে খামটা খুলল।
ভেতরে মাত্র একটি কাগজ।
তাতে লেখা—
"যদি সত্যিই সব জানতে চাও, তাহলে আজ রাত বারোটায় রায় ভিলার পেছনের লেকের ধারে এসো।
একাই আসবে।
মেঘলাকে সঙ্গে আনবে না।
— একজন, যে তোমাদের দু'জনকেই খুব ভালোভাবে চেনে।"
চিঠিটা পড়ে ঘরে নীরবতা নেমে এল।
মেঘলা প্রথম কথা বলল।
— "তুমি যাবে না।"
— "কেন?"
— "কারণ এটা ফাঁদ।"
অর্ণবও মাথা নাড়ল।
— "আমি একমত।"
কিন্তু আরোহীর মনে হচ্ছিল...
চিঠিটা মিথ্যে নয়।
তার ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে।
ঠিক তখনই লাইব্রেরির পুরোনো ঘড়িটা বাজতে শুরু করল।
ঢং...
ঢং...
ঢং...
মোট এগারোবার।
রাত ১১টা।
অর্থাৎ...
আর মাত্র এক ঘণ্টা।
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
জানালার কাঁচ বেয়ে ফোঁটাগুলো ধীরে ধীরে নেমে আসছে।
মেঘলা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— "জানো, ছোটবেলায় আমি এই লেকের ধারে বসে ছবি আঁকতাম।"
আরোহী তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
— "আমি কি তখন তোমার সঙ্গে ছিলাম?"
মেঘলা একটু হেসে বলল,
— "ছিলে।"
— "কেমন ছিলাম আমি?"
মেঘলা কিছুক্ষণ আরোহীর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— "তুমি সবসময় বৃষ্টিতে ভিজতে চাইতে।"
আরোহী অবাক হয়ে হেসে ফেলল।
— "এখনও চাই।"
দু'জনেই কয়েক সেকেন্ড নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর মেঘলা ধীরে ধীরে নিজের পকেট থেকে একটা ছোট্ট রুপোর লকেট বের করল।
লকেটটা আরোহীর হাতে দিয়ে বলল,
— "এটা রাখো।"
— "এটা তোমার?"
— "হ্যাঁ।"
— "আমাকে দিচ্ছ কেন?"
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
সে মৃদু হেসে বলল,
"কারণ কিছু জিনিস নিজের কাছে রাখার চেয়ে... বিশ্বাসের মানুষের কাছে রেখে যাওয়া নিরাপদ।"
আরোহী লকেটটা খুলে দেখল।
ভেতরে দুটি ছোট্ট ছবি।
একটায় ছোটবেলার মেঘলা।
অন্যটায়...
ছোট্ট আরোহী।
সে বিস্ময়ে মেঘলার দিকে তাকাল।
ঠিক তখনই—
বাইরে লেকের দিক থেকে একবার খুব উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠল।
তারপর নিভে গেল।
আবার জ্বলে উঠল।
যেন কেউ সংকেত দিচ্ছে।
অর্ণব জানালার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল—
"কেউ আমাদের আগেই লেকের ধারে পৌঁছে গেছে..."
লেকের দিক থেকে আসা আলোটা আবার জ্বলে উঠল।
একবার...
দু'বার...
তারপর অন্ধকার।
মেঘলার মুখে উদ্বেগ স্পষ্ট।
— "এটা স্বাভাবিক নয়।"
অর্ণব ঘড়ির দিকে তাকাল।
রাত ১১টা ১২।
আরোহী শান্ত গলায় বলল,
— "আমি যাব।"
— "না।" মেঘলা দৃঢ়ভাবে বলল।
— "কিন্তু যদি ওখানেই সব উত্তর থাকে?"
মেঘলা তার চোখের দিকে তাকাল।
অনেকক্ষণ।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— "সব উত্তর জানা সবসময় সুখের হয় না।"
আরোহী মৃদু হেসে বলল,
— "তবুও জানতে চাই।"
সৌমেন কাকু এতক্ষণ চুপ ছিলেন।
এবার তিনি পকেট থেকে একটি পুরোনো পকেট ঘড়ি বের করলেন।
রুপোলি রঙের।
ঘড়ির ঢাকনায় খোদাই করা একটি অক্ষর—
M
তিনি ঘড়িটা আরোহীর হাতে দিয়ে বললেন,
— "এটা তোমার কাছে রাখো।"
— "এটা কার?"
— "একসময়... মেঘলার বাবার ছিল।"
মেঘলা বিস্মিত হয়ে বলল,
— "এটা তো হারিয়ে গিয়েছিল!"
সৌমেন মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
— "কিছু জিনিস হারায় না। শুধু ঠিক সময়ের অপেক্ষা করে।"
চারজন লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে বাড়ির পেছনের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল।
বৃষ্টি থেমে গেছে।
ভেজা ঘাসে পা ফেললে চাপা শব্দ হচ্ছে।
চারপাশে এত নীরবতা যে নিজের শ্বাসের আওয়াজও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
দূরে লেকটা দেখা যাচ্ছে।
চাঁদের আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে পানির ওপর পড়ে রুপালি রেখা এঁকে দিয়েছে।
লেকের একেবারে মাঝখানে একটা ছোট কাঠের ঘাট।
আর সেই ঘাটের মাথায়...
একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
কালো ছাতা হাতে।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
আরোহী থেমে গেল।
লোকটাও নড়ল না।
শুধু দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ...
আরোহীর হাতে থাকা পকেট ঘড়িটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতরে একটা ছোট্ট কাগজ ভাঁজ করে রাখা।
সে অবাক হয়ে কাগজটা বের করল।
তাতে মাত্র একটি লাইন—
"জলের দিকে নয়... মানুষের চোখের দিকে তাকিও।"
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘাটে দাঁড়ানো লোকটা ধীরে ধীরে ছাতাটা নামাল।
চাঁদের আলো তার মুখে পড়ল।
আরোহীর বুক ধক করে উঠল।
লোকটার মুখে গভীর একটা কাটা দাগ।
কিন্তু...
তার চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে পরিচিত।
মেঘলা ফিসফিস করে বলল—
— "অসম্ভব..."
অর্ণবের ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
— "তুমি...?"
লোকটা ধীরে ধীরে হাসল।
সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।
ছিল বহু বছরের ক্লান্তি।
সে শান্ত গলায় বলল—
"তোমরা আমাকে মৃত ভেবেছিলে, তাই না?"
বাতাস হঠাৎ জোরে বইতে শুরু করল।
লেকের জল কেঁপে উঠল।
আরোহীর মনে হলো, এই মানুষটিকে সে কোথাও দেখেছে...
কিন্তু মনে করতে পারছে না।
লোকটা এক পা এগিয়ে এসে বলল—
"আজ রাতে শুধু একটা সত্য জানবে—চার বছর আগে যে গল্প শেষ হয়েছে বলে তোমরা বিশ্বাস করেছিলে... সেটা আসলে কখনও শেষই হয়নি।"
ঠিক তখনই...
লেকের শান্ত জল থেকে বুদবুদ উঠতে শুরু করল।
একটা...
দু'টো...
তারপর অসংখ্য।
মনে হলো, জলের নিচে কেউ নড়ছে।
মেঘলা আচমকা আরোহীর হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
— "পিছিয়ে যাও..."
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
লেকের মাঝখান থেকে ধীরে ধীরে একটি কাঠের নৌকা ভেসে উঠল।
নৌকায় বসে আছে...
একজন মেয়ে।
মাথা নিচু।
লম্বা ভেজা চুল মুখ ঢেকে রেখেছে।
আর তার হাতে...
একটা পুরোনো ক্যামেরা।
যেখানে শুধু তুমি
লেকের জল অস্বাভাবিকভাবে শান্ত হয়ে গেল।
নৌকাটা কোনো বৈঠা ছাড়াই ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে ভেসে আসছে।
চারপাশে বাতাস থেমে গেছে।
কেউ কথা বলছে না।
শুধু জলের গায়ে নৌকার কাঠের ঘষা লাগার শব্দ।
খরর... খরর...
আরোহীর চোখ স্থির হয়ে আছে নৌকার দিকে।
মেয়েটির মুখ এখনও দেখা যাচ্ছে না।
ভেজা চুল পুরো মুখ ঢেকে রেখেছে।
তার দুই হাতে শক্ত করে ধরা সেই পুরোনো ক্যামেরা।
মেঘলা কাঁপা গলায় বলল,
— "ওই ক্যামেরিটা..."
অর্ণব নিচু স্বরে বলল,
— "এটা তো..."
কথা শেষ করতে পারল না।
নৌকাটা ঘাটে এসে থামল।
মেয়েটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার মুখে কোনো ভয়ের ছাপ নেই।
শুধু গভীর ক্লান্তি।
সে সরাসরি আরোহীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— "তুমি এসেছ... অবশেষে।"
আরোহী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "তুমি আমাকে চেনো?"
মেয়েটি মৃদু হাসল।
— "তোমাকে না চিনে উপায় আছে?"
সে ক্যামেরাটা আরোহীর দিকে বাড়িয়ে দিল।
— "এটা নাও।"
আরোহী দ্বিধায় পড়ে গেল।
লোকটা, যে নিজেকে মৃত ভেবে সবাই ভুল করেছে বলছিল, এবার বলল,
— "নাও। সত্যিটা এই ক্যামেরার মধ্যেই বন্দি।"
মেঘলা হঠাৎ জোরে বলে উঠল,
— "না! এখনই না!"
কিন্তু ততক্ষণে আরোহী ক্যামেরাটা হাতে তুলে নিয়েছে।
ক্যামেরাটা আশ্চর্যজনকভাবে গরম।
যেন অনেকক্ষণ ধরে কেউ হাতে ধরে রেখেছিল।
সে পাওয়ার বাটনে চাপ দিল।
স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
প্রথম ছবিতে—
রায় ভিলার বাগান।
দ্বিতীয় ছবিতে—
ছোট্ট আরোহী আর ছোট্ট মেঘলা দৌড়ে খেলছে।
তৃতীয় ছবিতে—
তারা দু'জনে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে হাসছে।
আরোহীর চোখ ভিজে উঠল।
তারপর সে পরের ছবিতে গেল।
হঠাৎ তার মুখের রং বদলে গেল।
ছবিটা ঝাপসা।
মুষলধারে বৃষ্টি।
কেউ দৌড়াচ্ছে।
একটা ছোট্ট মেয়ে কাঁদছে।
আর ছবির এক কোণে...
একজন মানুষের হাতে চকচকে কিছু একটা।
ভালো করে তাকিয়ে বোঝা গেল—
একটি ছুরি।
আরোহীর হাত কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত পরের ছবিতে চাপ দিল।
কিন্তু স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে সাদা অক্ষরে ভেসে উঠল—
"শেষ ছবিটি দেখতে চাইলে... সত্যি মেনে নেওয়ার সাহস থাকতে হবে।"
কয়েক সেকেন্ড পর ক্যামেরাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই লেকের জলে একটা জোরালো ঢেউ উঠল।
ঘাট কেঁপে উঠল।
নৌকায় বসে থাকা মেয়েটি উঠে দাঁড়াল।
সে আরোহীর দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল—
— "পরেরবার যখন আমার সঙ্গে দেখা হবে... আমি আর তোমার প্রশ্নের উত্তর দেব না।"
— "তাহলে কী করবে?"
মেয়েটির চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি ফুটে উঠল।
সে বলল—
"আমি তোমার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিটা ফিরিয়ে দেব।"
এই বলে সে এক পা পিছিয়ে নৌকার ভেতরে দাঁড়াল।
কোনো বৈঠা ছাড়াই নৌকাটা আবার ধীরে ধীরে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যেতে লাগল।
আরোহী দৌড়ে ঘাটের শেষ প্রান্তে গিয়ে চিৎকার করল—
— "তোমার নামটা বলো!"
কুয়াশার ভেতর থেকে শেষবারের মতো উত্তর ভেসে এল—
"আমার নাম জানার আগে... নিজের গল্পটা মনে করো, আরোহী..."
কুয়াশা ঘন হয়ে সবকিছু ঢেকে দিল।
আর সেই মুহূর্তে আরোহীর মাথার ভেতর আবার এক ঝলক স্মৃতি ফিরে এল—
কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে ছোট্ট মেঘলা তার কনিষ্ঠ আঙুল বাড়িয়ে বলছে,
"প্রমিস করো... যত বড়ই হই না কেন, একদিন আবার দেখা হবে।"
আরোহী ফিসফিস করে বলল—
— "আমি... প্রমিস করেছিলাম..."
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পেছন থেকে গুলির শব্দে রাতের নীরবতা ভেঙে গেল।
ধাম!
মেঘলা চমকে উঠে আরোহীর দিকে দৌড়ে এল।
— 
চলবে...