Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

যেখানে শুধু তুমি - পর্ব 8

পর্ব ৮: গুলির শব্দ 
ধাম!
গুলির শব্দে পুরো লেকপাড় কেঁপে উঠল।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেউ বুঝতেই পারল না গুলিটা কাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছে।
তারপর...
মেঘলা হঠাৎ আরোহীকে জোরে ধাক্কা দিল।
— "নিচে!"
দুজনেই ঘাটের কাঠের মেঝেতে পড়ে গেল।
আরেকটা গুলি।
ঠাস!
এইবার গুলিটা এসে লাগল ঘাটের কাঠের রেলিংয়ে।
কাঠের টুকরো উড়ে এসে আরোহীর গালে ছোট্ট একটা কেটে গেল।
রক্তের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল।
অর্ণব চিৎকার করে উঠল—
— "সবাই আড়ালে যাও!"
সৌমেন কাকু আরোহীর হাত ধরে তাকে টেনে ঘাটের পাশে বড় পাথরের আড়ালে নিয়ে গেলেন।
চারপাশে আতঙ্ক।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে...
গুলির পর আর কোনো শব্দ নেই।
শুধু লেকের জল।
আর দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
পাঁচ মিনিট কেটে গেল।
কেউ আর গুলি চালাল না।
অর্ণব সাবধানে মাথা তুলে চারদিকে তাকাল।
ঘাট ফাঁকা।
কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
যে লোকটা কয়েক মিনিট আগে দাঁড়িয়ে ছিল...
সে নেই।
নৌকাটাও নেই।
যেন কিছুই ঘটেনি।
আরোহী ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার গাল থেকে রক্ত ঝরছে।
মেঘলা রুমাল বের করে আলতো করে ক্ষতটা চেপে ধরল।
— "ব্যথা করছে?"
আরোহী হেসে বলল,
— "তোমার হাতটা আছে... তাই খুব একটা না।"
মেঘলা কিছু বলল না।
তবে তার চোখে যে ভয় ছিল, সেটা লুকোতে পারল না।
ঠিক তখনই...
অর্ণব ঘাটের এক কোণে কিছু একটা দেখতে পেল।
সে এগিয়ে গিয়ে নিচু হয়ে সেটা তুলে নিল।
একটা কার্তুজের খোল।
সে অনেকক্ষণ ধরে সেটা দেখল।
তারপর মুখের রং বদলে গেল।
— "এটা..."
সৌমেন কাকু জিজ্ঞেস করলেন,
— "কী হয়েছে?"
অর্ণব খুব ধীরে বলল,
— "এটা নতুন নয়।"
— "মানে?"
— "এই ধরনের কার্তুজ এখন আর ব্যবহার হয় না।"
সে কার্তুজটা উল্টে দেখাল।
তাতে খোদাই করা একটি চিহ্ন।
R.S.
আরোহী অবাক হয়ে বলল,
— "এর মানে কী?"
অর্ণব উত্তর দেওয়ার আগেই...
মেঘলা ফিসফিস করে বলল—
— "রুদ্র সেন..."
চারজনই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।
মেঘলার ঠোঁট কাঁপছে।
সে খুব আস্তে বলল—
— "যে মানুষটার কথা আমরা এতদিন কাউকে বলিনি..."
বাতাস আবার বইতে শুরু করল।
লেকের জলে ছোট ছোট ঢেউ উঠল।
আরোহী বুঝতে পারল—
আজকের রাত শুধু একটা রহস্যের শুরু।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নামটা এখনও সামনে আসেনি।
রুদ্র সেন।
রুদ্র সেন।
নামটা উচ্চারণ করার পর যেন চারপাশের বাতাসও ভারী হয়ে গেল।
আরোহী মেঘলার দিকে তাকাল।
এই প্রথম সে মেঘলার চোখে ভয় নয়...
অপরাধবোধ দেখল।
— "রুদ্র সেন কে?"
মেঘলা কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু লেকের জলের দিকে তাকিয়ে রইল।
অর্ণব গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
— "যে সত্যিটা আমরা এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম... মনে হচ্ছে আজ আর লুকিয়ে রাখা যাবে না।"
রাত তখন প্রায় বারোটা পঁয়তাল্লিশ।
চারজন আবার রায় ভিলার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
ফেরার পথে কেউ কোনো কথা বলল না।
ভেজা পথ।
ঝরে পড়া কৃষ্ণচূড়ার ফুল।
আর দূরে বজ্রের আলো।
হঠাৎ আরোহীর চোখ পড়ল মাটিতে।
একটা ছোট্ট রুপোর ব্রেসলেট।
সে সেটা তুলে নিল।
ভেতরের দিকে খোদাই করা—
"M & A"
আরোহীর বুক কেঁপে উঠল।
— "এটা..."
মেঘলা ব্রেসলেটটা দেখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— "আমি ভেবেছিলাম এটা হারিয়ে গেছে।"
— "এটা কার?"
মেঘলা মৃদু হাসল।
চোখে জল।
— "আমাদের।"
রায় ভিলায় ফিরে সবাই ড্রইংরুমে বসল।
সৌমেন কাকু টেবিলের ওপর একটা পুরোনো ফাইল রাখলেন।
ফাইলটার কাগজগুলো হলদে হয়ে গেছে।
উপরে লেখা—
রায় ভিলা – ব্যক্তিগত নথি
অর্ণব ফাইলটা খুলল।
ভেতরে পুরোনো খবরের কাগজের কাটিং।
একটা শিরোনাম দেখে আরোহী থমকে গেল।
"শিল্পপতি দেবাশিস রায়ের বাড়িতে রহস্যজনক দুর্ঘটনা – একাধিক আহত।"
আরেকটা কাটিং—
"পরিবারের এক শিশুর স্মৃতিভ্রংশ, তদন্তে নতুন মোড়।"
আরোহী দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
— "শিশুটি... আমি?"
অর্ণব ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
— "হ্যাঁ।"
ঘর নিস্তব্ধ।
মেঘলা এবার প্রথমবারের মতো সবিস্তার বলতে শুরু করল।
— "সেদিন তুমি তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে এখানে এসেছিলে।"
— "তারপর?"
— "আমরা সারাদিন খেলেছিলাম। সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামল। তারপর..."
তার গলা আটকে গেল।
আরোহী আস্তে বলল,
— "তারপর কী হয়েছিল?"
মেঘলা চোখ বন্ধ করল।
— "একটা তর্ক..."
— "কার মধ্যে?"
— "বড়দের মধ্যে।"
অর্ণব বাকিটা বলল,
— "সেই তর্কের মাঝখানে একটা গুলির শব্দ শোনা যায়।"
আরোহীর নিঃশ্বাস আটকে গেল।
— "সেদিনও... গুলি?"
অর্ণব উত্তর দিল,
— "হ্যাঁ।"
ঠিক সেই মুহূর্তে...
ট্রিং... ট্রিং...
ড্রইংরুমের কোণে রাখা বহু বছরের পুরোনো ল্যান্ডলাইন ফোনটা বেজে উঠল।
চারজনই চমকে তাকাল।
সৌমেন কাকু ফিসফিস করে বললেন,
— "এই ফোনটা তো বহু বছর ধরে নষ্ট..."
ফোনটা আবার বেজে উঠল।
ট্রিং... ট্রিং...
অর্ণব ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলল।
— "হ্যালো?"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর অর্ণবের মুখের রং বদলে গেল।
— "কী বললেন?"
সে ধীরে ধীরে আরোহীর দিকে তাকাল।
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
— "আপনি... নিশ্চিত?"
কথা শেষ করে সে রিসিভারটা নামিয়ে রাখল।
ঘরে নিস্তব্ধতা।
আরোহী এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল—
— "কে ছিল?"
অর্ণব শুকনো গলায় বলল—
"ওরা বলছে... আজ রাতেই আরোহীর বাবা রায় ভিলায় আসছেন।"
আরোহী হতবাক।
— "কিন্তু... আমার বাবা তো জানেনই না আমি এখানে আছি!"
ঠিক তখনই...
বাইরে প্রধান ফটকের সামনে একটি কালো গাড়ি এসে থামার শব্দ শোনা গেল।
হেডলাইটের আলো জানালা ভেদ করে ঘরের ভেতরে পড়ল।
কেউ একজন গাড়ি থেকে নামল।
ধীরে ধীরে রায় ভিলার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

রায় ভিলার বাইরে কালো গাড়িটা থামল।
হেডলাইটের আলো ধীরে ধীরে নিভে গেল।
বৃষ্টির পর ভেজা মাটিতে কারও জুতোর শব্দ ভেসে এল।
ঠক... ঠক... ঠক...
আরোহীর বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।
সে জানালার কাছে এগিয়ে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে একজন মানুষ গেট খুলে ভেতরে ঢুকছেন।
লম্বা গড়ন।
হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ।
চুলে পাক ধরেছে।
মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
মেঘলা নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে।
অর্ণব ফিসফিস করে বলল,
— "দরজা খুলো না। আগে নিশ্চিত হতে হবে।"
কিন্তু ততক্ষণে—
ডিং... ডং...
রায় ভিলার পুরোনো কলিং বেল বেজে উঠল।
একবার।
দু'বার।
তারপর নীরবতা।
আরোহীর হাত কাঁপছিল।
তার মনে হচ্ছিল—
যদি সত্যিই বাবা হন?
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোল।
মেঘলা তার কবজি ধরে ফেলল।
— "এক মিনিট।"
— "কেন?"
— "একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।"
— "কী?"
মেঘলা খুব শান্ত গলায় বলল,
— "তোমার বাবা কি কখনও তোমাকে বলেছেন, ছোটবেলায় তোমার একটা বড় দুর্ঘটনা হয়েছিল?"
আরোহী থমকে গেল।
সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
— "হ্যাঁ... কিন্তু উনি কখনও বিস্তারিত বলেননি। শুধু বলতেন, সেই দিনের কথা মনে করার চেষ্টা না করতে।"
মেঘলা চোখ নামিয়ে নিল।
— "তাহলে... উনি অনেক কিছু জানেন।"
ঠিক তখনই আবার কলিং বেল।
ডিং... ডং...
এবার বাইরে থেকে একটা পরিচিত গলা ভেসে এল—
— "আরু... দরজা খোল।"
আরোহীর চোখ বড় হয়ে গেল।
এই নামে তাকে ডাকেন মাত্র একজন।
তার বাবা।
সে আর অপেক্ষা করল না।
দরজার ছিটকিনি খুলে ধীরে ধীরে দরজাটা টেনে দিল।
দরজা খুলতেই...
বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ।
চোখে ক্লান্তি।
মুখে দাড়ি।
কাঁধে ভেজা শাল।
তিনি আরোহীকে দেখেই থমকে গেলেন।
দু'জন কয়েক সেকেন্ড শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর তিনি খুব আস্তে বললেন—
— "তুই... ঠিক আছিস তো?"
আরোহীর চোখ ভিজে উঠল।
— "বাবা..."
সে ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে...
তার বাবা তাকে জড়িয়ে ধরলেন না।
বরং তাঁর চোখ চলে গেল মেঘলার দিকে।
এক দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর তিনি কাঁপা গলায় বললেন—
"তাহলে... তুমি বেঁচে আছ, মেঘলা?"
ঘরের সবাই স্তব্ধ।
মেঘলার চোখেও বিস্ময়।
সে ধীরে ধীরে উত্তর দিল—
— "কাকু... আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?"
আরোহীর বাবা চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর এমন একটা কথা বললেন, যা পুরো গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিল—
"আমি তোমাকে চিনব না কেন? সেই রাতে... তোমাকে বাঁচাতে না পারার অপরাধবোধ নিয়েই তো আমি এত বছর বেঁচে আছি।"
ঘরে কেউ কোনো কথা বলতে পারল না।
আরোহী শুধু বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে একটাই প্রশ্ন—
সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল?
চলবে—