যে মানুষটাকে মৃত ভাবা হয়েছিল
রায় ভিলার বারান্দায় সবাই এসে দাঁড়াল।
গেটের সামনে একটি পুরোনো সাইকেল।
তার পাশে সত্তরের কাছাকাছি বয়সের এক বৃদ্ধ।
ধুতি-পাঞ্জাবি ভিজে গেছে বৃষ্টিতে।
হাতে একটি কাপড়ে মোড়া ছোট্ট প্যাকেট।
চোখে মোটা কাচের চশমা।
কিন্তু তাঁর দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত স্থিরতা।
এসিপি ঈশিতা এগিয়ে গিয়ে বললেন,
— "আপনি বলেছিলেন, ঋত্বিক সেনকে দেখেছেন?"
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
— "হ্যাঁ, দেখেছি।"
— "কোথায়?"
— "স্টেশনে।"
অর্ণব অবাক হয়ে বলল,
— "কোন স্টেশন?"
— "শেওড়াফুলি।"
বৃদ্ধ একটু থামলেন।
— "আজ বিকেল পাঁচটার দিকে।"
আরোহীর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
— "আপনি নিশ্চিত?"
বৃদ্ধ এবার পকেট থেকে একটা পুরোনো ছবি বের করলেন।
ছবিটা সময়ে হলদে হয়ে গেছে।
তিনি ছবির একজন কিশোরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন—
— "এই ছেলেটাই আজ আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল।"
ছবিটা দেখে সবাই নিঃশব্দ।
এটা সেই একই ছবি...
যেখানে ছোট্ট আরোহী, ছোট্ট মেঘলা আর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ঋত্বিক।
ঈশিতা জিজ্ঞেস করলেন,
— "এত বছর পর আপনি চিনলেন কীভাবে?"
বৃদ্ধ হালকা হাসলেন।
— "সব মুখ ভুলে যাই, কিন্তু কিছু চোখ কোনোদিন ভুলি না।"
তিনি কাপড়ে মোড়া প্যাকেটটা আরোহীর হাতে দিলেন।
— "এটা ও আমাকে দিয়ে গেছে।"
— "আমাকে?"
— "হ্যাঁ।"
— "কিন্তু... সে জানল কী করে আমি এখানে?"
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— "ও শুধু বলেছিল..."
তিনি চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
"যে মেয়েটা বৃষ্টিকে এখনও ভালোবাসে... তার হাতেই এটা তুলে দেবেন।"
মেঘলা নিঃশব্দে আরোহীর দিকে তাকাল।
এই কথাটা খুব কম মানুষই জানত।
আরোহী কাঁপা হাতে কাপড়টা খুলল।
ভেতরে একটি পুরোনো ফিল্ম রোল।
আর একটি ছোট্ট কাগজ।
তাতে লেখা—
"ডিজিটাল ছবি বদলে দেওয়া যায়। ফিল্ম মিথ্যে বলে না।"
অমিতাভ চমকে উঠলেন।
— "তাহলে কেউ ইচ্ছে করে ভিডিও আর ডিজিটাল প্রমাণ নষ্ট করেছে..."
ঈশিতা ধীরে বললেন,
— "কিন্তু ফিল্মটা বেঁচে গেছে।"
ঠিক তখনই বৃদ্ধ আবার বললেন,
— "আর একটা কথা আছে।"
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
— "ছেলেটার ডান হাতে একটা পুরোনো কাটা দাগ ছিল।"
আরোহীর মাথার ভেতর যেন হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল।
সে নিজের অজান্তেই বলে ফেলল—
— "ঘুড়ির সুতো..."
সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
মেঘলা ধীরে জিজ্ঞেস করল,
— "তুমি কী বললে?"
আরোহীর চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে।
সে কপালে হাত রেখে বলল—
— "আমার মনে পড়ছে..."
— "কী মনে পড়ছে?"
সে ধীরে ধীরে বলল—
— "একদিন আমরা তিনজন মিলে ঘুড়ি ওড়াচ্ছিলাম..."
— "আমরা তিনজন?"
— "আমি... তুমি... আর ঋত্বিক।"
তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল।
— "ঘুড়ির মাঞ্জা কেটে ওর হাতে গভীর দাগ পড়েছিল। আমি খুব কেঁদেছিলাম..."
মেঘলার চোখেও জল চলে এল।
সে ফিসফিস করে বলল—
— "তাহলে... তোমার স্মৃতি ফিরতে শুরু করেছে।"
ঠিক সেই মুহূর্তে...
ঈশিতার ফোন বেজে উঠল।
তিনি কল রিসিভ করলেন।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ শুনলেন।
তারপর তাঁর মুখের অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ বদলে গেল।
— "কী বলছেন!"
অর্ণব এগিয়ে এল।
— "কী হয়েছে?"
ঈশিতা ধীরে ফোনটা নামিয়ে বললেন—
"ফরেনসিক টিম জানিয়েছে... পেনড্রাইভটা আজই কেউ খুলেছে।"
ঘরে সবাই স্তব্ধ।
অর্ণব অবিশ্বাসের স্বরে বলল—
— "অসম্ভব! ওটা তো এতক্ষণ আমাদের কাছেই ছিল!"
ঈশিতা নিচু গলায় বললেন—
"তার মানে... এই বাড়িতে এমন কেউ আছে, যাকে আমরা এখনও চিনি না।"
রাত তখন প্রায় দুটো।
বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে।
রায় ভিলার পুরোনো দেয়ালগুলো ভিজে আলোয় চকচক করছে।
কিন্তু বাড়ির ভেতরে যেন আরও ঘন হয়ে উঠেছে নীরবতা।
ঈশিতার বলা কথাটা এখনও সবার মাথায় ঘুরছে।
"পেনড্রাইভটা আজই কেউ খুলেছে।"
আরোহী ধীরে ধীরে বলল,
— "মানে... আমাদের আগে কেউ এটা দেখেছে?"
ঈশিতা মাথা নাড়লেন।
— "ফরেনসিক রিপোর্ট তাই বলছে। পেনড্রাইভের শেষ অ্যাক্সেস হয়েছে আজ সন্ধ্যা ৭টা ১৮ মিনিটে।"
অর্ণব অবাক হয়ে বলল,
— "কিন্তু তখন তো বাড়িতে আমরা কেউ ছিলাম না!"
অমিতাভ নিচু গলায় বললেন,
— "তাহলে একজন ছিল..."
ঠিক তখনই সৌমেন কাকু যেন হঠাৎ কিছু মনে করে উঠে দাঁড়ালেন।
— "এক মিনিট..."
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
তিনি দ্রুত রান্নাঘরের পাশের ছোট্ট ঘরটার দিকে চলে গেলেন।
কয়েক মিনিট পরে ফিরে এলেন হাতে একটা মোটা খাতা নিয়ে।
— "এটা রায় ভিলার ভিজিটর রেজিস্টার।"
অর্ণব বিস্মিত।
— "তুমি এখনও এটা রাখো?"
— "তোমার বাবার নিয়ম ছিল। বাড়িতে যে-ই আসুক, নাম লিখতে হবে।"
ঈশিতা খাতাটা খুললেন।
বেশিরভাগ পাতাই ফাঁকা।
তারপর শেষ পাতায় এসে তিনি থেমে গেলেন।
আজকের তারিখ।
সময় লেখা—
সন্ধ্যা ৬টা ৫৫।
নামের জায়গায় শুধু একটা শব্দ—
"অতিথি"
ঠিকানার জায়গা ফাঁকা।
মোবাইল নম্বরও নেই।
শুধু সই।
অদ্ভুত একটা চিহ্ন।
দুটি অর্ধচন্দ্রের মাঝখানে একটি ছোট্ট তারা।
অমিতাভের মুখের রং বদলে গেল।
— "এই চিহ্নটা..."
ঈশিতা তাকালেন।
— "চেনেন?"
— "হ্যাঁ... আমি এটা আগে দেখেছি।"
— "কোথায়?"
অমিতাভ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— "ঋত্বিকের ডায়েরিতে।"
মেঘলা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
— "ডায়েরি!"
সে দৌড়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
আরোহীও তার পেছনে গেল।
ঘরে ঢুকে মেঘলা আলমারির ভেতর থেকে একটা পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ বের করল।
ব্যাগ খুলতেই বেরিয়ে এল কয়েকটা চিঠি আর একটা পাতলা নীল ডায়েরি।
— "এটা ঋত্বিক আমাকে দিয়েছিল।"
আরোহী অবাক।
— "তুমি আগে বলোনি কেন?"
মেঘলা নিচু গলায় বলল,
— "কারণ শেষের কয়েকটা পৃষ্ঠা আমি কখনও খুলতে পারিনি।"
সে ডায়েরিটা আরোহীর হাতে দিল।
প্রথম পাতায় লেখা—
"যদি একদিন আমি হারিয়ে যাই, তাহলে আমাকে খুঁজবে না। সত্যিটাকে খুঁজো।"
আরোহীর হাত কেঁপে উঠল।
সে ধীরে ধীরে শেষের দিকের পৃষ্ঠাগুলো খুলল।
একটা পাতায় শুধু সেই একই চিহ্ন।
দুটি অর্ধচন্দ্র।
মাঝখানে একটা তারা।
আর তার নিচে মাত্র চারটি শব্দ—
"ও আমাদের মধ্যেই আছে।"
ঘরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল।
আরোহী আর মেঘলা একে অপরের দিকে তাকাল।
"আমাদের মধ্যেই"...
মানে?
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে একটা ভাঙা কাচের শব্দ ভেসে এল।
ঝনন!
দু'জন ছুটে নিচে নেমে এল।
ড্রইংরুমে এসে দেখে...
টেবিলের ওপর রাখা ফিল্ম রোলটা নেই।
তার জায়গায় রাখা একটা ছোট্ট সাদা কাগজ।
ঈশিতা কাগজটা তুলে পড়লেন।
তাতে লেখা—
"প্রমাণ লুকিয়ে রাখা যায়, সত্যি নয়।
যদি সাহস থাকে, কাল বিকেল পাঁচটায় কলেজ স্ট্রিটের পুরোনো বইয়ের দোকানে এসো।
— একজন পুরোনো বন্ধু।"
আরোহীর বুক কেঁপে উঠল।
কলেজ স্ট্রিট...
যেখান থেকে তার আর মেঘলার প্রথম দেখা—অথবা, হয়তো দ্বিতীয়বারের দেখা—শুরু হয়েছিল।
ঠিক তখনই মেঘলা খুব আস্তে বলল—
"আমার মনে হচ্ছে... কেউ আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আগেই জানে।"
জানালার বাইরে, অন্ধকারে, এক মুহূর্তের জন্য যেন একজন মানুষের ছায়া দেখা গেল।
সে দাঁড়িয়ে ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় মিলিয়ে গেল.
সারা রাত আর কারও চোখে ঘুম এল না।
রায় ভিলার প্রতিটি ঘরে পুলিশ পাহারা বসানো হলো।
তবুও অদ্ভুত একটা অনুভূতি সবাইকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল—
কেউ যেন এখনও বাড়ির ভেতরেই আছে।
ভোর পাঁচটা।
বৃষ্টি থেমে গিয়ে আকাশে হালকা নীল আলো ফুটতে শুরু করেছে।
আরোহী বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা।
কিন্তু তার মন অন্য কোথাও।
পেছন থেকে মেঘলা এসে দাঁড়াল।
— "ঘুমাওনি?"
আরোহী মাথা নাড়ল।
— "তুমিও না?"
— "ঘুম আসেনি।"
কয়েক মুহূর্ত দু'জনেই চুপ।
সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে বৃষ্টির জল টুপটুপ করে পড়ছে।
মেঘলা ধীরে বলল,
— "জানো, ছোটবেলায় আমি খুব ভয় পেতাম বজ্রপাতকে।"
আরোহী অবাক হয়ে তাকাল।
— "সত্যি?"
— "হ্যাঁ।"
মেঘলা হেসে ফেলল।
— "আর তুমি কী করতে জানো?"
— "কী?"
— "আমার দুই কান চেপে ধরে বলতে, 'চোখ বন্ধ করো। শব্দটা কেটে যাবে।'"
আরোহী কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন করে উঠল।
একটা দৃশ্য ঝলকের মতো ফিরে এল।
ছোট্ট মেঘলা কাঁদছে।
সে নিজে দুই হাত দিয়ে মেঘলার কান ঢেকে রেখেছে।
আর বলছে—
"আমি থাকলে তোমার কিছু হবে না।"
স্মৃতিটা মিলিয়ে যেতেই আরোহীর চোখ ভিজে উঠল।
— "আমার... মনে পড়ছে।"
মেঘলা ধীরে তার হাতটা ধরল।
— "সব মনে পড়বে। সময় লাগবে, কিন্তু পড়বে।"
প্রথমবার, কোনো দ্বিধা ছাড়াই, আরোহীও মেঘলার হাত শক্ত করে ধরে রাখল।
দু'জনেই কিছু বলল না।
কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই একটা অদ্ভুত বিশ্বাস জন্ম নিল।
সকাল দশটা।
এসিপি ঈশিতা সবাইকে ড্রইংরুমে ডাকলেন।
টেবিলের ওপর তিনি কয়েকটা পুরোনো ছবি সাজিয়ে রাখলেন।
— "আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি।"
অর্ণব ছবিগুলোর দিকে তাকাল।
সবগুলোই রায় ভিলার।
কিন্তু...
প্রতিটি ছবিতেই একটা মিল আছে।
একই মানুষ।
কখনও দূরে দাঁড়িয়ে।
কখনও জানালার পাশে।
কখনও গাছের আড়ালে।
মুখ কখনও স্পষ্ট নয়।
ঈশিতা ছবিগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন—
— "এই মানুষটা অন্তত আট বছর ধরে বিভিন্ন ছবিতে আছে।"
অমিতাভ অবাক।
— "কিন্তু কেউ খেয়াল করেনি?"
— "কারণ কেউ ওকে খুঁজছিল না।"
আরোহী ছবিগুলো একটার পর একটা দেখতে লাগল।
শেষ ছবিটা হাতে নিয়ে তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
ছবিটা তোলা হয়েছিল মাত্র তিন দিন আগে।
কলেজ স্ট্রিটে।
সেখানে সে নিজে দাঁড়িয়ে আছে।
বই হাতে।
আর তার ঠিক পেছনে...
একজন মানুষ।
মুখ ঝাপসা।
কিন্তু ডান হাতে স্পষ্ট একটা পুরোনো কাটা দাগ।
ঘুড়ির মাঞ্জার মতো।
আরোহীর ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল—
— "ঋত্বিক..."
ঠিক তখনই ঈশিতার ফোনে একটা নতুন বার্তা এল।
অজানা নম্বর।
তিনি খুলে দেখলেন।
একটা মাত্র ছবি।
ছবিতে আজকের তারিখ।
আজকের সময়।
আরোহী আর মেঘলা এইমাত্র বারান্দায় হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
অর্থাৎ...
কেউ কয়েক মিনিট আগেই তাদের ছবি তুলে পাঠিয়েছে।
ছবির নিচে মাত্র একটি লাইন—
"ওদের ওপর নজর রাখুন। খুনি এখনও ওদের খুব কাছেই আছে।"
ঘরে উপস্থিত সবাই একসঙ্গে একে অপরের দিকে তাকাল।
কারও মুখে কোনো কথা নেই।
কারণ প্রথমবার...
রহস্যটা শুধু অতীতের নয়।
খুনি এখনও বর্তমানেই আছে।
—
চলবে...