Featured Books
বিভাগ
শেয়ারড

যেখানে শুধু তুমি - পর্ব 10

মাটির নিচে চাপা সত্য

রায় ভিলার সামনে একের পর এক তিনটি কালো গাড়ি এসে থামল।
নীল-লাল আলো বৃষ্টিভেজা দেয়ালে প্রতিফলিত হতে লাগল।
পুলিশের সাইরেন ধীরে ধীরে থেমে গেল।
কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই একসঙ্গে গেটের দিকে তাকাল।
অমিতাভ চক্রবর্তী গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন।
— "এত তাড়াতাড়ি খবর পৌঁছে গেল?"
গাড়ির দরজা খুলে কয়েকজন পুলিশ অফিসার নেমে এলেন।
সবার সামনে একজন নারী অফিসার।
বয়স ত্রিশের কাছাকাছি।
চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ভেজা চুল শক্ত করে বাঁধা।
তিনি সামনে এসে পরিচয় দিলেন—
— "আমি এসিপি ঈশিতা ঘোষ, ক্রাইম ব্রাঞ্চ।"
তিনি একবার চারপাশে তাকিয়ে থেমে গেলেন।
তার দৃষ্টি গিয়ে থামল খোলা ট্রাঙ্কটার ওপর।
— "বাক্সটা কেউ স্পর্শ করবেন না।"
অর্ণব বলল,
— "আমরা শুধু খুলেছি।"
ঈশিতা মাথা নাড়লেন।
— "ঠিক করেছেন। এখন থেকে এটা প্রমাণ।"
একজন কনস্টেবল গ্লাভস পরে ট্রাঙ্কের ভেতরের জিনিসগুলো বের করতে লাগল।
প্রথমে নীল স্কুলব্যাগ।
তারপর কয়েকটা খাতা।
তারপর একটা ক্যাসেট।
সবশেষে সেই চিঠি।
ঈশিতা সাবধানে খামটা খুললেন।
বৃষ্টির কারণে কাগজটা কিছুটা ভিজে গেছে।
তবুও লেখা পড়া যাচ্ছে।
তিনি পড়তে শুরু করলেন—
"আমার নাম ঋত্বিক সেন। যদি কেউ এই চিঠি পড়ে, তাহলে বুঝবে আমি অনেকদিন আগেই হারিয়ে গেছি..."
সবাই নিঃশ্বাস আটকে শুনছে।
"আমি কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। কারণ যে মানুষটাকে সবাই ভালো বলে জানে... সেই মানুষটার কাছেই আমি সবচেয়ে ভয় পাই।"
আরোহীর বাবা কেঁপে উঠলেন।
মেঘলা ধীরে ধীরে আরোহীর হাত চেপে ধরল।
চিঠি চলতে থাকল—
"যদি আমি বেঁচে না থাকি, তাহলে আরোহী আর মেঘলাকে দোষ দিও না। ওরা নির্দোষ। ওরা কিছুই মনে রাখতে পারবে না..."
আরোহীর চোখে জল এসে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল—
— "আমাদের নাম..."
ঈশিতা শেষ লাইনটা পড়লেন—
"যে সত্যিটা সবাই লুকোচ্ছে, সেটা এই ব্যাগের ভেতর আছে।"
সবাইয়ের দৃষ্টি এবার নীল স্কুলব্যাগের দিকে।
ঈশিতা ধীরে ধীরে ব্যাগের চেইন খুললেন।
ভেতরে একটা নোটবুক।
একটা পেন্সিল বক্স।
আর কাপড়ে মোড়া একটা ছোট্ট ভিডিও ক্যামেরা।
অমিতাভ বিস্ময়ে বললেন—
— "এই মডেলটা তো ২০০৯ সালে খুব কম মানুষের কাছেই ছিল।"
ঈশিতা ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে দেখলেন।
ব্যাটারি নেই।
মেমোরি কার্ডও নেই।
তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন—
— "কেউ ইচ্ছে করেই কার্ডটা খুলে নিয়েছে।"
ঠিক তখনই...
পেন্সিল বক্সটা মাটিতে পড়ে খুলে গেল।
ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বেরিয়ে এল।
আরোহী সেটা তুলে নিল।
কাগজে ছোট্ট একটা মানচিত্র আঁকা।
রায় ভিলার।
একটা লাল গোল দাগ দেওয়া জায়গা।
তার পাশে মাত্র তিনটি শব্দ—
"সঙ্গীত কক্ষের মেঝে।"
অর্ণব অবাক হয়ে বলল—
— "আমাদের বাড়িতে তো অনেক বছর ধরে ওই ঘর বন্ধ!"
অমিতাভ ধীরে বললেন—
— "তাহলে পরের উত্তরটা ওখানেই লুকিয়ে আছে।"
ঠিক সেই মুহূর্তে...
রায় ভিলার ভেতর থেকে ভেসে এল—
পিয়ানোর একটা সুর।
একটা মাত্র নোট।
তারপর আরেকটা।
তারপর ধীরে ধীরে পুরো সুর।
সবাই জমে গেল।
অর্ণব ফিসফিস করে বলল—
— "অসম্ভব..."
মেঘলা কাঁপা গলায় বলল—
— "ওই পিয়ানোটা... পনেরো বছর ধরে কেউ বাজায়নি।"
আর সুরটা যেন তাদের ডাকছে।
পিয়ানোর সুরটা ধীরে ধীরে পুরো বাড়িজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
না খুব জোরে।
না খুব আস্তে।
ঠিক এমনভাবে, যেন কেউ ইচ্ছে করেই তাদের ভেতরে ডেকে নিচ্ছে।
বৃষ্টির শব্দ, পুলিশের ওয়াকিটকির আওয়াজ—সবকিছুকে ছাপিয়ে সেই সুর ভেসে আসছে।
এসিপি ঈশিতা ঘোষ এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না।
— "দু'জন কনস্টেবল আমার সঙ্গে আসুন। বাকিরা বাইরে থাকুন।"
অমিতাভ বললেন,
— "আমিও যাচ্ছি।"
অর্ণব দৃঢ় গলায় বলল,
— "এটা আমাদের বাড়ি। আমরাও যাব।"
ঈশিতা কয়েক সেকেন্ড ভেবে মাথা নাড়লেন।
— "ঠিক আছে। তবে কেউ কোনো জিনিস স্পর্শ করবেন না।"
রায় ভিলার ভেতরে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল।
দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো ছবিগুলো টর্চের আলোয় যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে।
করিডোর পেরিয়ে তারা বাড়ির একেবারে দক্ষিণ দিকে পৌঁছাল।
দরজার ওপরে ধুলো জমা পিতলের ফলক।
"সঙ্গীত কক্ষ"
দরজায় মোটা লোহার তালা।
অর্ণব অবাক হয়ে বলল,
— "এই তালার চাবি তো বহু বছর আগে হারিয়ে গেছে।"
ঈশিতা কনস্টেবলকে ইশারা করলেন।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তালা ভেঙে গেল।
ঠাং!
দরজাটা ধীরে ধীরে খুলতেই...
পিয়ানোর সুর হঠাৎ থেমে গেল।
পুরো ঘর আবার নিস্তব্ধ।
ঘরটা বড়।
জানালাগুলো বন্ধ।
এক কোণে কালো রঙের গ্র্যান্ড পিয়ানো।
তার ওপরে ধুলোর আস্তরণ।
আরোহী ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
সে পিয়ানোর কীবোর্ডে তাকিয়ে থমকে গেল।
ধুলোর ওপর স্পষ্ট আঙুলের দাগ।
মনে হচ্ছে...
এইমাত্র কেউ বাজিয়ে উঠে গেছে।
ঈশিতা নিচু হয়ে দাগগুলো দেখলেন।
— "এগুলো নতুন।"
অমিতাভ চারদিকে টর্চের আলো ফেলছিলেন।
হঠাৎ তিনি বললেন,
— "এদিকে আসুন।"
ঘরের মাঝখানে কাঠের মেঝের একটা অংশ অন্য জায়গার তুলনায় একটু গাঢ়।
ঠিক সেই জায়গাটাতেই মানচিত্রে লাল গোল দাগ ছিল।
অর্ণব হাঁটু গেড়ে বসে কাঠে হাত বুলিয়ে বলল,
— "এখানে ফাঁপা শব্দ হচ্ছে।"
সে আলতো চাপ দিতেই—
ক্লিক।
কাঠের একটা ছোট অংশ ওপরে উঠে এল।
তার নিচে একটা সরু লোহার বাক্স।
ঈশিতা গ্লাভস পরে বাক্সটা বের করলেন।
এবার কোনো তালা নেই।
ঢাকনা খুলতেই দেখা গেল—
একটা ছোট্ট ডায়েরি।
একটা পুরোনো পেনড্রাইভ।
আর একটা সাদা খাম।
খামের ওপর মাত্র একটি লাইন লেখা—
"যদি আমি বেঁচে না থাকি, তাহলে এই খামটা শুধু আরোহী পড়বে।"
আরোহীর হাত কেঁপে উঠল।
— "আবার... আমার নাম?"
মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
চোখে প্রশ্ন।
চোখে উদ্বেগ।
ঠিক তখনই...
ঘরের কোণে রাখা পুরোনো আয়নায় একটা নড়াচড়া দেখা গেল।
আরোহী স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আয়নার দিকে তাকাল।
সবাইয়ের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে।
ঈশিতা...
অর্ণব...
মেঘলা...
অমিতাভ...
কিন্তু...
তাদের পেছনে আরও একজন দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা শার্ট পরা এক কিশোর।
মুখে মৃদু হাসি।
সে শুধু ঠোঁট নেড়ে বলল—
"খামটা এখনই খুলবে না..."
আরোহী চমকে পেছনে ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
আবার আয়নার দিকে তাকাতেই—
সেখানেও আর কেউ নেই।
শুধু পাঁচজনের বিস্মিত মুখ।
আরোহী কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
— "আমি... আমি কাউকে দেখলাম।"
ঈশিতা দ্রুত জিজ্ঞেস করলেন,
— "কোথায়?"
— "আয়নায়।"
ঘরের সবাই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
এবার সেখানে শুধু তাদেরই প্রতিচ্ছবি।
অমিতাভ শান্ত গলায় বললেন,
— "ট্রমার কারণে অনেক সময় মস্তিষ্ক পুরোনো স্মৃতিকে বর্তমানের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলে।"
আরোহী কিছু বলল না।
কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, সে যা দেখেছে, সেটা কল্পনা নয়।
মেঘলা আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখল।
— "তুমি ঠিক আছো?"
— "জানি না..."
ঈশিতা সাদা খামটা আরোহীর হাতে তুলে দিলেন।
— "এটা তোমার জন্য লেখা। কিন্তু আমি চাই, খোলার আগে সবাই উপস্থিত থাকুক।"
আরোহী মাথা নাড়ল।
সে খুব সাবধানে খামটা খুলল।
ভেতরে একটি মাত্র কাগজ।
আর একটি ছোট্ট চাবি।
কাগজে হাতের লেখা স্পষ্ট—
"আরোহী, যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তাহলে বুঝবে আমি সময়মতো তোমার কাছে পৌঁছাতে পারিনি। তুমি আমাকে হয়তো মনে রাখোনি, কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি। যদি সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে প্রথমে এই চাবিটা কোথায় লাগে সেটা খুঁজে বের করো। উত্তর রায় ভিলায় নয়... উত্তর তোমার নিজের বাড়িতে।"
নিচে একটি নাম।
— ঋত্বিক
ঘরে আবার নীরবতা।
আরোহীর বাবা ধীরে ধীরে চাবিটা হাতে নিলেন।
হঠাৎ তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
— "এই চাবিটা..."
অর্ণব প্রশ্ন করল,
— "চেনা লাগছে?"
তিনি মাথা নাড়লেন।
— "হ্যাঁ।"
— "কোথায় লাগে?"
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— "আরোহীর মায়ের কাঠের আলমারিতে ঠিক এমনই একটা ছোট তালা ছিল।"
আরোহী বিস্মিত।
— "মায়ের আলমারি?"
— "তোমার মা মারা যাওয়ার পর আলমারিটা আর কেউ খোলেনি।"
তার বুক কেঁপে উঠল।
— "কিন্তু... মা তো বলতেন ওখানে শুধু পুরোনো কাপড় আছে।"
বাবা নিচু গলায় বললেন,
— "হয়তো আমাদের দু'জনকেই মিথ্যে বলা হয়েছিল।"
ঠিক তখনই ঈশিতা পেনড্রাইভটা হাতে নিয়ে বললেন,
— "এটাও গুরুত্বপূর্ণ।"
অমিতাভ বললেন,
— "যদি এর মধ্যে ভিডিও থাকে, তাহলে ঘটনাটার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এটাই হতে পারে।"
ঈশিতা মাথা নাড়লেন।
— "কিন্তু এটা এখুনি দেখা যাবে না। ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করতে হবে।"
অর্ণব একটু হতাশ হয়ে বলল,
— "তাহলে আবার অপেক্ষা?"
ঈশিতা মৃদু হেসে বললেন,
— "সত্যি কখনও তাড়াহুড়ো করে সামনে আসে না।"
ঠিক সেই সময়...
একজন কনস্টেবল দৌড়ে সঙ্গীত কক্ষের দরজায় এসে দাঁড়াল।
সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—
— "ম্যাডাম!"
ঈশিতা ফিরে তাকালেন।
— "কী হয়েছে?"
— "গেটের বাইরে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন।"
— "তিনি কী চান?"
কনস্টেবল গম্ভীর মুখে উত্তর দিল—
"তিনি বলছেন, তিনি ঋত্বিক সেনকে আজ বিকেলেও জীবিত দেখেছেন।"
ঘরের সবাই একসঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গেল।
বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে।
কিন্তু রায় ভিলার ওপর নেমে এল আরও গভীর এক নীরবতা।
চলবে...