পরাণ বঁধুয়া
পর্ব - ১৮
ওদিকে ভাড়ার ক্যাবে বুবুন বসেছে ড্রাইভারের পাশে। ছোটকা, ছোটমা আর পুপুল পিছনের সিটে বসলেও মুন্ডুগুলো সামনের সিটের ঘাড়ে। তারা বুবুনকে ট্রেনিং দিচ্ছে ছোট্ট, মিষ্টি রুমুকে কিভাবে আদরযত্ন করে বুবুন ওর মন জিতে নেবে। অবশ্য দুজনের একজনকেও আভাস দেওয়া হয়নি, ওদের আজ মুখোমুখি বসিয়ে এরা কেটে পড়বে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা একটু ফাঁকা ক্যাফের সামনে গাড়ি থামায় তীর্থ। ওর ইশারায় আগেই মৌ পুপুলকে ফোন করে বলে দিয়েছে, এখানে থামতে। গাড়ি থেকে সবাই নামে, হাত পা ছড়ায়। সুন্দর ছোট কোজি একটা ক্যাফে। রবিবার, বেড়ানোর দিন হলেও বিকেলেই ভিড় শুরু হয়নি এখনও। পুপুল বুবুনকে বলে, "যা না, রুমুকে ডেকে নিয়ে ভেতরে যা। আমরা পিছনে আসছি। তুই এই ফাঁকে একটু চেয়ার টেনে ম্যাডামকে বসিয়ে নাইটদের মতো শ্যিভালরি দেখা।"
--"রাঙাদা, এক্ষুণি বাড়ি থেকে খেয়েদেয়ে বেরোলি। দু ঘন্টা পুরো হয়নি, এখন কি খাবি ক্যাফেতে?" বুবুন হতভম্ব।
--"আচ্ছা ইয়ে ছেলে তো তুই। ক্যাফে ছাড়া বসব কোথায়? কথা বলব কি করে? আর খাবি কেন? প্রেম করতে গেলে একখানা কোল্ড কফি নিয়ে সারাদিন বসে থাকতে হয়। প্রেমিকার সামনে কেউ হাঁউ হাঁউ করে খায়? নে চল রুমুর সঙ্গে দুগগা বলে প্রেমটা শুরু করে দে। আমি আশীর্বাদ করে দিলাম, ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ।" পুপুল সত্যি ভাইয়ের মাথায় আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত ঠেকায়।
--"আরে ধ্যাত, থাম তো। খালি ইয়ার্কি। আমি এখন রুমুর সঙ্গে প্রেম করব?" খেঁকিয়ে ওঠে বুবুন।
--"আরে আস্তে। চেঁচাচ্ছিস কেন? আমরা তো বাধা দিচ্ছি না। বরং তোকে হেল্প করছি। আচ্ছা চল, আর একটু হেল্প করে দি। আমিই রুমুকে নিয়ে যাচ্ছি।" ফিচেল হাসি হেসে গলা চড়ায় পুপুল, "রুমু আয় আমার সঙ্গে। এখানে আয়।"
রুমু এগিয়ে আসে, গটগট করে ঢোকে রাঙাদার পাশাপাশি। দুপা গিয়ে পুপুল ভাইকে ইশারায় সামনে যেতে বলে। এরা কি বলে বসবে ঠিক নেই, বুবুন তাই এগিয়ে যায়।
ক্যাফেটা বেশ ছোট। তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর সুন্দর করে সাজানো। মালিক হয়তো সঙ্গীতপ্রেমী। দেয়ালে দেয়ালে বব ডিলন, এলভিস প্রিসলে, জন লেনন, পল ম্যাকার্টনি, এলটন জন, মাইকেল জ্যাকসন থেকে এনরিকো ইগলেসিয়াস। সব টেবিলে ফুলদানিতে ফুল।
কয়েকটা দুজন বসার পুঁচকে টেবিল, কয়েকটা চারজন বসার। আবার দুটো মাঝারি টেবিল জুড়ে তার চারিদিকে দশটা চেয়ার সাজানো। রুমু ঐ বড় টেবিলটার দিকে পা বাড়িয়েছিল। পুপুল পট করে থামিয়ে বলে, "তুই এটাতে বস রুমু।"
দুজন মুখোমুখি বসার মতো ছোট টেবিল। সেটার দিকে পুপুল আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে রুমু অবাক চোখে তাকায়।
পুপুল বলে, "বোস না। সব তো খালি। সবাই আলাদা বসব। তুলিরা একটু নিজেরা গল্প করবে।" রুমু বিশ্বাস করে ঢুকে বসে। বুবুনও এগিয়ে যায়। ও বুঝেছে, তুলিদের সঙ্গে সঙ্গে ওরাও যাতে একটু আলাদা কথা বলে, তাই এই ব্যবস্থা। যদিও কি কথা বলবে কিছুই মাথায় আসে না।
--"তোরা বোস। আমি ওগুলোকে ডেকে আনি। আড্ডা শুরু হলে আর হুঁশ থাকে না, রেস্টুরেন্টের বাইরে আছে না ভিতর।" ব্যস্তবাগীশের মতো বেরিয়ে যায় পুপুল। আসলে পালিয়ে যায়।
রুমু বসে পড়েছে। বুবুন চেয়ার টেনে ওর মুখোমুখি বসে ফ্যাকাশে হেসে বলে, "আসলে রাঙাদাই সবচেয়ে আড্ডাবাজ।"
রুমু লেস ইন্টারেস্টেড বুবুনের দেওয়া ইনফরমেশনে। ক্যাফের দেওয়ালে চোখ রেখে বলে, "আই নো হিম। ইউ নীডন্ট বদার।"
অপমানিত লাগে বুবুনের। আজকের জেনারেশনের ছেলে মেয়েরা এত হার্শ কমেন্টর। ভেবেই ধাক্কা খায়। ও যতটা জানে রুমু মিলির চেয়ে ছ সাত মাস ছোট। তাহলে ওর চেয়ে মেরেকেটে সাত বছরের ছোট হবে কি হবে না। এর মধ্যেই ধরণ ধারণে একটা অন্য জেনারেশন এসে গেছে? নাকি রুমুর উপর মুম্বাইয়ের ফাস্ট লাইফের ছাপ? মেজাজটা তিতকুটে মেরে গেলেও গবেষণার সুযোগ পায় না। ওর ফোন বেজে উঠেছে, রাঙাদা।
ফোন ধরে অবশ্য মেজাজ আরও তিরিক্ষি হয়ে যায়, এরা আর এদের প্র্যাঙ্ক, ইনকরিজিবল। ফোনের ভিতরে সবকটার গলা পাওয়া যাচ্ছে, "এ্যাই আমরা চললাম। আমাদের খোঁজার চেষ্টা করিস না। তোর হাতে তিন ঘন্টা সময়। বৌকে পটা বসে বসে। তিন ঘন্টা পরে এসে আমরা দেখব কতটা প্রোগ্রেস হল।"
তুমুল বিরক্ত বুবুন কিছু বলার আগেই ফোন কেটে দিয়েছে ওরা। ফোনটা টেবিলে রেখে কিছুটা নার্ভাসভাবে বলে, "রুমঝুম, ওরা আমাদের এখানে রেখে নিজেরা অন্য কোথাও চলে গেছে।"
--"পার্ডন?" রুমুও হাঁ।
--"বুঝতে পারছ না? আমাদের এখানে ঢুকিয়ে দিয়ে ওরা চলে গেছে। দুষ্টুবুদ্ধি আর কি। এসব বুদ্ধি বেরোয় ছোটকার মাথা থেকে। আমরা বড় হয়ে গেলাম, ছোটকা আর বড় হল না।" সদা হাস্যোজ্জল, দুষ্টুবুদ্ধির ডিপো, কখনো বয়স না বাড়া ছোটকা, যাকে বুবুন মাঝে মাঝে টেনিদার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে, তার কথা মনে করে হালকা একটা হাসি ফোটে ওর মুখে।
রুমু সম্পূর্ণ অন্য অর্থ করে হাসিটার।
চলবে